নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন আধুনিক হচ্ছে। নতুন দ্বিতল ভবন, প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, ছাউনিÑসব মিলিয়ে বদলে যাওয়ার কথা পুরোনো স্টেশনটির চেহারা। কিন্তু সেই বদলের অপেক্ষাটাই যেন দীর্ঘ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় বছর পরও শেষ হয়নি আধুনিকায়নের কাজ। কয়েক দফা বন্ধ থাকার পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হলেও ধীরগতিতে এগোচ্ছে নতুন স্টেশন ভবনের কাজ। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি যাত্রীসেবায়। পুরোনো প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলায় কমেছে বসার জায়গা। পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার নেই। মূল ভবনের বাইরে অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় নতুন ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীদের অনেকেই পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। নির্মাণকাজের মধ্যেই সীমিত জায়গায় চলছে স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রমও।
সরেজমিনে গত কয়েক দিন চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন প্ল্যাটফর্মের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মে ছাউনিও তৈরি করা হয়েছে। তবে নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবনের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও প্লাস্টারের কাজ চলছে, কোথাও টাইলস বসানো হচ্ছে। আবার কোনো অংশে চলছে রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ। নির্মাণসামগ্রী ও কাজের সরঞ্জামও রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের অনেককেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কোনো কোনো যাত্রী প্ল্যাটফর্মের এক পাশে কিংবা অপেক্ষাকৃত অস্বস্তিকর জায়গায় বসে সময় কাটাচ্ছেন। ট্রেন বিলম্বিত হলে এ দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি হয় সবচেয়ে বেশি।
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনের যাত্রী সৈয়দ আবু জাফর বলেন, স্টেশনটি আধুনিক হচ্ছে, এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ট্রেনের জন্য অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, অথচ বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও নারী-শিশুদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করে যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা চালু করা হোক। আরেক যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, কাজ শুরুর সময় তারা ভেবেছিলেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি সুন্দর ও আধুনিক স্টেশন পাবেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কাজ চলছেই। এখনো ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। তার ভাষায়, নির্মাণকাজ চলতেই পারে, কিন্তু এ সময়ে যাত্রীদের বসার জায়গা, টয়লেট ও টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা সহজ রাখা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
যাত্রীদের অভিযোগের বড় একটি অংশ স্টেশনের শৌচাগার ঘিরে। নির্মাণকাজের কারণে পর্যাপ্ত ও ব্যবহার উপযোগী শৌচাগারের সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ যাত্রার আগে কিংবা ট্রেন থেকে নেমে প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন যাত্রীরা। নারী যাত্রী শাহনাজ পারভীন বলেন, একজন নারী যাত্রীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট এবং বসার জায়গা। কিন্তু নির্মাণকাজের কারণে এখন এসব সুবিধা খুবই সীমিত। বাচ্চা বা বয়স্ক কাউকে নিয়ে এলে সমস্যাটা আরও বেশি বোঝা যায়।
নির্মাণকাজের কারণে স্টেশনের টিকিট ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। মূল স্টেশন ভবনের বাইরে অস্থায়ীভাবে টিকিট কাউন্টার চালু রাখা হয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী স্টেশনের ভেতরে প্রবেশের পর জানতে পারেন, টিকিট সংগ্রহ করতে তাদের আবার বাইরে যেতে হবে। বিশেষ করে প্রথমবার চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন ব্যবহার করা যাত্রীদের জন্য বিষয়টি আরও বিভ্রান্তিকর। ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় আগে স্টেশনে পৌঁছানো যাত্রীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ে তাড়াহুড়াও তৈরি হচ্ছে। নতুন ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় শুধু যাত্রীসেবাই নয়, স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নথিপত্র ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ সীমিত জায়গার মধ্যে পরিচালনা করতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় যাত্রীসেবা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত জায়গায় অফিসের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। যাত্রীদের বসার স্থান, টিকিট সংগ্রহ ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও সাময়িক অসুবিধা রয়েছে। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে যতটা সম্ভব যাত্রীদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন ভবন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলে এসব সমস্যা থাকবে না এবং যাত্রীসেবার মানও অনেক উন্নত হবে।
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। বাংলাদেশের রেল যোগাযোগের ইতিহাসের সঙ্গেও এ জেলার রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রেল যোগাযোগের সূচনা হয়। সেই ঐতিহাসিক রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর একটি চুয়াডাঙ্গা। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো বদলে আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে স্টেশনটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবন, প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্মে ছাউনি, যাত্রীদের অপেক্ষার স্থানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরটিসি ও এসএইচজে জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৪০ দিন। সে হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষেও পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিভিন্ন জটিলতায় মাঝখানে কয়েক দফা নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে আবার কাজ চলছে। চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নকশাসংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে মাঝখানে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এখন নিয়মিত কাজ চলছে। ভবনের মূল কাঠামোর কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছে। বর্তমানে প্লাস্টার, টাইলস, রংসহ ফিনিশিংয়ের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
আধুনিক স্টেশন পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের প্রত্যাশা, শুধু নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যেই যেন আধুনিকায়ন সীমাবদ্ধ না থাকে। স্টেশনটি বাস্তব অর্থেই যাত্রীবান্ধব করে তুলতে হবে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শৌচাগার, নিরাপদ অপেক্ষাগার, সহজে দৃশ্যমান টিকিট কাউন্টার এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি তাদের। আর কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত অস্থায়ীভাবে হলেও এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন তারা। তাদের ভাষায়, স্টেশন আধুনিক হওয়ার অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু যাত্রীসেবার ভোগান্তি যেন সেই অপেক্ষার সঙ্গে দীর্ঘায়িত না হয়।


