নতুন ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত কিছু কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া থাকতেই পারে। একজন আবেদনকারী সত্যিই আগে ভোটার হয়েছেন কি না, তার বয়স ও পরিচয় সঠিক কি নাÑএসব যাচাই করা নির্বাচন কার্যালয়ের দায়িত্ব। বিশেষ করে কেউ তথ্য গোপন করলে বা ভুয়া তথ্য দিয়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করলে তা ঠেকানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সতর্কতা আর অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মধ্যে পার্থক্য আছে। কোনো কাগজপত্রের প্রয়োজন হলে সেটি শুরুতেই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া উচিত। অনলাইনে আবেদন করার সময় বা আবেদন গ্রহণের আগে আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় কাগজের একটি সুস্পষ্ট তালিকা দেয়া গেলে বারবার অফিসে আসার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ আলমডাঙ্গায় অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার পরও নতুন করে কাগজ আনতে বলা হচ্ছে। কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত সত্যায়ন চাওয়া হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামার জন্য স্ট্যাম্প ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। এখানেই মূল প্রশ্নÑযা প্রয়োজন, তা কি লিখিত ও সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম হিসেবে জানানো হচ্ছে? আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মেজর আহাম্মেদের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দেয়ার কথা নির্বাচন অফিস থেকে বলা হয়নি। সাধারণ কাগজেও লিখিত দেয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, কিছু আবেদনকারী শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য গোপন করছেন এবং তদন্ত করে কয়েকজনের শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের স্বার্থে লিখিত নেয়া হচ্ছে। যদি সত্যিই কোনো আবেদনকারী তথ্য গোপন করে থাকেন, সেটি অবশ্যই তদন্ত করা উচিত। ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা যায় না। কিন্তু সেই তদন্তের প্রক্রিয়াটিও হতে হবে স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত ও বিধিসম্মত। কোনো নাগরিকের শিক্ষাগত সনদ না থাকলে তাকে কীভাবে যাচাই করা হবে, কী ধরনের বিকল্প প্রমাণ গ্রহণযোগ্যÑএ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। বিশেষ করে যেসব মানুষ দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট বা নানা কারণে প্রাথমিকের পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি, তাদের জন্য শিক্ষাগত সনদ দেখানো সম্ভব নাও হতে পারে। আব্দুস সালামের বক্তব্য তারই বাস্তব উদাহরণ। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাবার অসুস্থতার কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। জীবিকার তাগিদে কাজে নেমেছেন। এখন ভোটার হতে গিয়ে যদি তাকে এমন কাগজপত্রের পেছনে ছুটতে হয়, যা তার পক্ষে সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব, তাহলে রাষ্ট্রীয় নাগরিকসেবার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক নারী ভোটার স্থানান্তরের জন্য কাবিননামা চাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এটি সত্য হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, কোন পরিস্থিতিতে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি কিংবা কাবিননামা প্রয়োজন এবং কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজন নয়Ñএ বিষয়ে আবেদনকারীকে পরিষ্কার ধারণা দেয়া জরুরি। একজন নাগরিকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজ চাওয়া আর অপ্রাসঙ্গিক কাগজ চাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো নথি যদি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়, তার আইনি ভিত্তিও সেবাপ্রার্থীকে জানানো উচিত। এতে ভুল বোঝাবুঝি যেমন কমবে, তেমনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও অযথা অভিযোগের সুযোগ কমে যাবে। এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেইÑসেবাপ্রার্থীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে শুরুতেই স্পষ্ট নির্দেশনা পাচ্ছেন না। ফলে দূরদূরান্ত থেকে এসে তাদের আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের প্রবেশপথে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘নতুন ভোটার হতে যা যা লাগবে’, ‘ভোটার এলাকা স্থানান্তরে যা লাগবে’, ‘কোন কাগজে সত্যায়ন প্রয়োজন’, ‘কোন ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামা লাগবে’Ñএমন সহজ ভাষায় তালিকা টানিয়ে দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে হেল্প ডেস্ক চালু করা যেতে পারে। এতে সেবাপ্রার্থী যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি কর্মকর্তাদের ওপরও অযথা চাপ কমবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই ধরনের আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা। কারও জন্য এক নিয়ম, অন্যের জন্য আরেক নিয়মÑএমন ধারণা তৈরি হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোটার তালিকা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। তাই ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকাতে কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বৈধ নাগরিকের জন্য দরজা খোলা রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কঠোরতা যদি স্বচ্ছ নিয়মের ভিত্তিতে হয়, মানুষ তা মেনে নেয়। কিন্তু নিয়ম যদি অস্পষ্ট হয় এবং তার প্রয়োগে ভিন্নতা দেখা দেয়, তখনই তৈরি হয় ভোগান্তি ও ক্ষোভ। আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগকারী নাগরিকদের বক্তব্য যেমন যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি নির্বাচন কর্মকর্তার ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হলে জেলা নির্বাচন অফিসের পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সেবাপ্রার্থীদের জন্য লিখিত ও সহজ নির্দেশনা, নির্ধারিত কাগজপত্রের তালিকা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের প্রথম প্রত্যাশা খুব বেশি নয়Ñতিনি যেন তার অধিকারটি নিয়ম মেনে, সম্মানের সঙ্গে এবং অযথা হয়রানি ছাড়াই পান। ভোটার হওয়ার মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি একজন তরুণকে বারবার অফিসের দরজায় ঘুরতে হয়, তবে সেই সেবা ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও ঘাটতি আছে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা নয়, সেই তালিকায় নাগরিককে অন্তর্ভুক্তির পথটিও সহজ, স্বচ্ছ ও মানবিক করা।


