নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় বাস ও ইজিবাইক মালিক-শ্রমিকদের বিরোধ নিরসনে সড়কে গাড়ি আটকানো বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কোনো শ্রমিক সড়কে বাস, অটোরিকশা বা অন্য যানবাহন আটকাতে পারবেন না। সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা ও যানবাহন চলাচল তদারকির দায়িত্ব পালন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল রবিবার বিকেল ৫টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে বাস, ট্রাক ও অটোভ্যান-রিকশার মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফের উদ্যোগে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি বাস ও ইজিবাইক মালিক-চালকদের বিরোধকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধ, মারধরের অভিযোগ ও যানজটের ঘটনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেয়া হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল নিয়ে আপত্তি বা বিরোধ দেখা দিলে শ্রমিকেরা নিজেরা বাধা দেবেন না। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর আগে চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে অসুস্থ রোগী নিয়ে আলুকদিয়ার দিকে যাওয়ার পথে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক দৌলতদিয়াড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আটকে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় ইজিবাইকে থাকা রোগীর স্বজন রাজু মাস্টারের সঙ্গে পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বাগ্বিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে এ ঘটনার প্রতিবাদে আলুকদিয়া এলাকায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। এতে চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে আলুকদিয়া পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার সড়কে যানজট সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
রাজু মাস্টার বলেন, তার ছেলে চার দিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহীতে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার ট্রেন ধরতে ছেলেকে নিয়ে ইজিবাইকে করে রনা হয়েছিলেন তিনি। পথে কয়েকজন তাদের গাড়ি থামিয়ে বাগ্বিতণ্ডা শুরু করেন। একপর্যায়ে তার কলার ধরে ইজিবাইক থেকে নামিয়ে ঘুষি মারা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাকে ঘরে আটকে রাখার হুমকিও দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন রাজু মাস্টার।
অন্যদিকে অভিযুক্ত বাস শ্রমিক সবুজ জানান, ইজিবাইকটি আলুকদিয়ার দিকে যাওয়ার পথে দৌলতদিয়াড় বাসস্ট্যান্ডে থামানো হয়। গাড়িতে রাজু মাস্টার, তার অসুস্থ ছেলে ও আসমানখালির আরও দুজন যাত্রী ছিলেন। অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানার পর অন্য দুই যাত্রীকে নামতে বলা হয়। এ সময় রাজু মাস্টারের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয় বলে দাবি করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।
চুয়াডাঙ্গা বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সভাপতি হাসান ইমরান বকুল বলেন, এক উপজেলার ইজিবাইক অন্য উপজেলায় প্রবেশ করতে পারবে না এবং মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে পারবে নাÑএমন সিদ্ধান্ত আগে নেয়া হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেও সমাধান হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। জেলা মোটরযান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে মোটরশ্রমিকদের সতর্ক থাকতে হবে।
সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সড়কে কোনো রকম লাঠিয়াল বাহিনী থাকবে না। সড়ক হবে নির্বিঘ্ন চলাচলের জায়গা। সড়কে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রশাসন বিষয়টি দেখবে। তিনি আরও বলেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সবাইকে নির্দেশনা দেয়া হবে। জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি হাসান ইমাম বকুল ও সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন মুক্তা, জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি আবুল কালাম, জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সফিকুল ইসলাম পিটু, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুজ্জামান, জেলা ট্রাফিক পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম, আলুকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আল-বেল্লাল হোসেন, সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জাহিদ হোসেন টিপু, আলুকদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক খাব্বাব হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক জহুরুল ইসলাম। এছাড়া অটো মালিক-চালক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা সভায় অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ে বিরোধের সমাধান আইনানুগ প্রক্রিয়ায় করা গেলে সংঘর্ষ, অবরোধ ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে। তবে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।


