কার্পাসডাঙ্গা প্রতিনিধি:
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারেনি। কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে উপার্জন করে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের সুবুলপুর গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম। ধারদেনা ও ঋণ করে ১০ কাঠা জমি লিজ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন আনারকলির বাগান। গাছে গাছে ধরেছিল ফল। স্বপ্ন দেখেছিলেন, ফল বিক্রি করে ঋণ শোধ করবেন, বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একটু ভালোভাবে চলবেন। কিন্তু ফল বিক্রির আগেই রাতের আঁধারে তার বাগানের ফলন্ত গাছগুলো কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এক রাতেই মাটিতে মিশে যায় তার পরিশ্রম, বিনিয়োগ আর ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।
গতকাল বুধবার সকালে বাগানের পরিচর্যা করতে গিয়ে গাছগুলো কাটা অবস্থায় দেখতে পান মনিরুল। একের পর এক ফলন্ত গাছ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি। মাঠের ধুলোয় বসে কাটা গাছগুলো বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধা মা, পথচারী ও স্থানীয় কৃষকদের চোখও ভিজে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও মনিরুল কখনো ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করতে চাননি। নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহের প্রত্যয়ে ধারদেনা করে এবং স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে সুবুলপুর গ্রামে ১০ কাঠা জমি লিজ নেন তিনি। এরপর নিজ হাতে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও গাছের পরিচর্যা করে গড়ে তোলেন আনারকলির বাগান। বিশেষ জাতের ফল আনারকলি চাষে তার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গাছগুলো বড় হয়ে উঠেছিল। এবার গাছে ভালো ফলনও হয়েছিল। ফল বিক্রির মৌসুম সামনে রেখে মনিরুলের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তার পরিকল্পনা ছিল, ফল বিক্রির টাকা দিয়ে প্রথমে ঋণের বোঝা কমাবেন, এরপর বৃদ্ধা মা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে দিন কাটাবেন। কিন্তু সেই আশায় এখন নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি প্রতিবন্ধী মানুষ, কারও কাছে হাত পাতিনি। নিজে খেটে খাওয়ার জন্য ধারদেনা করে ১০ কাঠা জমি লিজ নিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে আনারকলির বাগান করেছিলাম। ফলও ভালো হয়েছিল। ভেবেছিলাম, দেনা মিটিয়ে সংসারটা একটু ভালোভাবে চালাব। কিন্তু শত্রুরা আমার পেটে লাথি মারল! এখন আমি এই ঋণের টাকা দেব কীভাবে? বৃদ্ধা মা আর পরিবার নিয়ে বাঁচব কীভাবে? মনিরুলের দাবি, পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুর্বৃত্তরা তার বাগানের গাছ কেটে ফেলেছে। তবে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঋণের চাপে দিশেহারা মনিরুল ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


