চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবন, প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, ছাউনি, যাত্রীদের অপেক্ষার স্থানসহ আধুনিক নানা সুবিধা যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু একটি ভালো উদ্যোগ যখন নির্ধারিত সময় পেরিয়েও শেষ হয় না, তখন সেটি জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনের বর্তমান চিত্র ঠিক তেমনই। প্রায় দেড় বছর আগে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষেও প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হয়নি। বরং নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন কোনো সাধারণ স্টেশন নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের ইতিহাস। ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রেল যোগাযোগের সূচনা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেশন চুয়াডাঙ্গা। ফলে এই স্টেশনের আধুনিকায়ন শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশারও প্রতিফলন। প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালে নেয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৪০ দিন। বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরটিসি ও এসএইচজে জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। মাঝখানে কয়েক দফা কাজ বন্ধ থাকার পর এখন আবার নির্মাণকাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নকশাসংক্রান্ত জটিলতায় কাজ ব্যাহত হয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এখন সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলোÑএকটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে পারে, কাজের নানা জটিলতাও থাকতে পারে কিন্তু সেই সময়ে যাত্রীসেবার ন্যূনতম মান কেন নিশ্চিত করা হবে না?
সরেজমিন চিত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন প্ল্যাটফর্মের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে, ছাউনিও নির্মিত হয়েছে। কিন্তু স্টেশন ভবনের কোথাও প্লাস্টার, কোথাও টাইলস, কোথাও রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম পড়ে আছে বিভিন্ন স্থানে। ফলে যাত্রীদের বসার জায়গা কমেছে। ট্রেনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা যাত্রীদের অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। ট্রেন বিলম্বিত হলে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় শৌচাগার। একটি রেলস্টেশনে পর্যাপ্ত, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি যাত্রীসেবার মৌলিক অংশ। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। নির্মাণকাজের কারণে যদি স্থায়ী সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই। টিকিট ব্যবস্থাপনাতেও একই ধরনের অসুবিধা তৈরি হয়েছে। মূল ভবনের বাইরে অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় নতুন বা দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কেউ স্টেশনের ভেতরে গিয়ে জানতে পারছেন, টিকিট নিতে হলে তাকে আবার বাইরে যেতে হবে। ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীদের মধ্যে তাড়াহুড়া ও উদ্বেগ বাড়ে। একটি আধুনিক রেলস্টেশনের লক্ষ্য যেখানে যাত্রীর চলাচল সহজ করা, সেখানে নির্মাণকাজের কারণে যদি যাত্রীর পথই জটিল হয়ে যায়, তবে ব্যবস্থাপনার ঘাটতিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকারÑস্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম। নির্মাণকাজের মধ্যে সীমিত জায়গায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে যেমন তাদের কাজের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি এর প্রভাব পরোক্ষভাবে যাত্রীসেবাতেও পড়তে পারে। নির্মাণকাজ চলবেÑএটি স্বাভাবিক। বড় অবকাঠামো নির্মাণে সাময়িক দুর্ভোগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দুর্ভোগকে অনিবার্য বলে মেনে নিয়ে বছরের পর বছর যাত্রীদের মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং নির্মাণকাজ চলাকালীন ‘যাত্রীসেবা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা’ থাকা উচিত ছিল। অস্থায়ী হলেও পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, নারী ও পুরুষের পৃথক পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, দৃশ্যমান টিকিট কাউন্টার, তথ্যফলক এবং নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেত। আমরা মনে করি, চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন আধুনিকায়ন প্রকল্পে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সময়সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কাজ কেন বারবার বন্ধ হয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ কতবার বাড়ানো হয়েছে, নতুন সময়সীমা কী এবং সেই সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছেÑএসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। শুধু ‘আগামী বছরের মাঝামাঝি’ কাজ শেষ করার আশা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি। একই সঙ্গে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেলওয়েকে জরুরি ভিত্তিতে যাত্রীদের মৌলিক সুবিধাগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ স্টেশন আধুনিক হওয়ার অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু যাত্রীসেবার ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
চুয়াডাঙ্গার মানুষ একটি আধুনিক স্টেশন চান, ঠিকই। তবে তারা শুধু ঝকঝকে একটি ভবন চান না তারা চান স্বস্তিদায়ক যাত্রা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পর্যাপ্ত বসার জায়গা, সহজ টিকিট ব্যবস্থা, নিরাপদ অপেক্ষার স্থান এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা। আধুনিকায়নের প্রকৃত সাফল্য ভবনের আকারে নয়, যাত্রীর স্বস্তিতে। তাই চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন আধুনিকায়ন প্রকল্পকে আর দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে না ফেলে দ্রুততম সময়ে শেষ করা হোক। আর তত দিন পর্যন্ত নির্মাণকাজের অজুহাতে যেন যাত্রীসেবার মৌলিক অধিকার সংকুচিত না হয়Ñএটাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা।


