কৃষকের উৎপাদনব্যয় কমানো এবং খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করে। বিশেষ করে ডিএপি, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কৃষকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সরকারি সার যদি বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই গুদামজাত করা হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিষয় থাকে নাÑএর সঙ্গে জড়িয়ে যায় কৃষকের স্বার্থ, বাজারব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং খাদ্য উৎপাদনের নিরাপত্তা। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া মজুত করে রাখা ৪০৩ বস্তা সরকারি ডিএপি সার জব্দের ঘটনা তাই উদ্বেগজনক। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে জীবননগর-দত্তনগর সড়কের ‘মেসার্স শান্তনা এন্টারপ্রাইজ’ থেকে এসব সার উদ্ধার হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সার বিক্রির বৈধ কাগজপত্র বা লাইসেন্স ছিল না। এরপরও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সার মজুত করে বিক্রি করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রথমেই প্রশ্ন আসে, এত বিপুল পরিমাণ সরকারি সার কীভাবে একটি লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের গুদামে গেল? ৪০৩ বস্তা সার এক দিনে কিংবা হঠাৎ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের গুদামে জমা হওয়ার কথা নয়। এর পেছনে সরবরাহ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রয় ব্যবস্থার কোনো না কোনো পর্যায়ে দুর্বলতা বা অনিয়ম থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু যে প্রতিষ্ঠানে সার পাওয়া গেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। সার কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে এসেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে নিয়ম ভাঙা হয়েছেÑএসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। সরকারি সার কৃষকের জন্য নির্ধারিত। ভর্তুকি দেয়া এই সার বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একজন কৃষক যদি নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার না পান, তাহলে তাকে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হতে হয়। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ে, অন্যদিকে কৃষকের লাভ কমে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময়মতো সার না পাওয়ায় ফসলের উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। অভিজ্ঞতা বলে, শুধু অভিযান চালিয়ে সার জব্দ করলেই বাজারে অনিয়ম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বৈধ ডিলারদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা, তাদের মজুত ও বিক্রির হিসাব যাচাই করা এবং নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি হচ্ছে কি নাÑতা মাঠপর্যায়ে তদারক করতে হবে। জীবননগরের এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের এমন তৎপরতা অব্যাহত থাকা দরকার। তবে অভিযান যেন কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। জীবননগরসহ পুরো চুয়াডাঙ্গা জেলার সার বিতরণব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। সরকারি গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো পর্যন্ত একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑকৃষকের জন্য বরাদ্দ সার নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি বরদাশত করা যাবে না। সরকারি সার কালোবাজারে চলে যাওয়া মানে কৃষকের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার। তাই জীবননগরে জব্দ হওয়া ৪০৩ বস্তা সারের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা খতিয়ে দেখে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কোনো লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান সরকারি সার মজুত বা বিক্রির সুযোগ না পায়, সে জন্য প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা জরুরি। কৃষকের সার কৃষকের কাছেই পৌঁছাতে হবেÑগুদামে আটকে বা কালোবাজারে নয়। সরকারি সারের সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করাই হতে পারে কৃষকের প্রতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দায়বদ্ধতার একটি।


