তিতুদহ প্রতিনিধি:
সাপের ফণা তোলা, দুলে দুলে ওঠা সাপ আর সাপুড়েদের নিপুণ কসরত। সঙ্গে বাঁশি, ঢোল ও সারিন্দার সুরে ঐতিহ্যবাহী ঝাপান গান। এমনই ব্যতিক্রমী আয়োজনে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছিল চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ ইউনিয়নের ছোটশলুয়া গ্রাম। হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয় উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী সাপের ঝাপান খেলার। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঝাঁপান খেলা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনকে ঘিরে সকাল থেকেই ছোটশলুয়া গ্রামে ছিল উৎসবের আমেজ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। দুপুরের পর আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু খেলা দেখতে ছুটে আসেন। একপর্যায়ে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে জমজমাট।
খেলা দেখতে আসা মানুষের মধ্যে ছিল নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতি। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। আবার অনেক কৌতূহলী দর্শক মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন সাপুড়েদের কসরত ও ঝাপান খেলার নানা দৃশ্য। ঝাপান খেলায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে কয়েকজন অভিজ্ঞ সাপুড়ে ছোটশলুয়া গ্রামে হাজির হন। তাদের সঙ্গে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাপ। খেলার মাঠে কাঠের পিঁড়ি ও বাক্সের ওপর সাপ রেখে শুরু হয় নানা ধরনের কসরত। বাঁশি, ঢোল ও সারিন্দার তালে তালে সাপুড়েরা তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। কখনো সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো দুলতে থাকে সুরের তালে। সাপুড়েদের নিপুণ কসরত আর সাপের নানা অঙ্গভঙ্গি দেখতে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি কৌতূহল। বিশেষ করে শিশুরা ছিল সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত। খেলার পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ঝাপান গান। সাপুড়েদের কসরত ও সাপের অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে তাল মিলিয়ে লোকজ সুরে গান পরিবেশন করা হলে আয়োজনটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
আয়োজক কমিটির সদস্য শামীম বলেন, আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতেই প্রতি বছরের মতো এবারও ঝাপান খেলার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়। এর সঙ্গে গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে। হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা আমাদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ঝাপান খেলার আয়োজন হতো। বর্ষাকালে কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে সাপুড়েরা দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে আসতেন। বাঁশি ও ঢোলের তালে সাপের খেলা দেখতে মানুষের ভিড় জমত। সময়ের সঙ্গে বিনোদনের ধরন বদলে যাওয়ায় এসব আয়োজন এখন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে ছোটশলুয়ার মতো আয়োজনে পুরোনো দিনের সেই স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসে। দিনব্যাপী আয়োজন ঘিরে ছোটশলুয়া গ্রামে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে খেলা শেষ হলে অংশগ্রহণকারী সাপুড়েদের মধ্যে বিজয়ী ও সেরা খেলোয়াড়দের পুরস্কার দেয়া হয়। পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ ঝাপান খেলা।


