কার্পাসডাঙ্গা প্রতিনিধি:
দামুড়হুদা উপজেলার দুলালনগর ও কালিয়াবকরী গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। নদটির ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে তারা শুনে আসছেন, একদিন এখানে সেতু হবে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি। বর্ষায় ঝুঁকি নিয়ে নদ পারাপার, আর শুকনো মৌসুমে কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাচলÑএভাবেই চলছে দুই গ্রামের মানুষের জীবন।
অবশেষে সেই অপেক্ষা শেষ হওয়ার আশায় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তারা। দুলালনগর ও কালিয়াবকরী গ্রামের মধ্যবর্তী ভৈরব নদের ওপর সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে মাপজোখের কাজ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে আসা একটি জরিপ দল নদের দুই পাড়ে মাপ নির্ণয়ের কাজ শুরু করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ও আশাবাদ তৈরি হয়। জরিপের সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শতাধিক গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা, জরিপ, নকশা ও দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে দুই গ্রামের হাজারো মানুষের। তবে মাপজোখ শুরু হলেও নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো জানা যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুলালনগর ও কালিয়াবকরী গ্রামের মানুষের যোগাযোগের পথে ভৈরব নদ দীর্ঘদিন ধরে বড় বাধা হয়ে আছে। নদ পারাপারের জন্য স্থায়ী সেতু না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নদে পানি বেড়ে গেলে বাঁশের সাঁকো কিংবা নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের। কখনো কখনো ঝুঁকির কারণে নদ পারাপারও কঠিন হয়ে পড়ে। শুকনো মৌসুমে নদে পানি কমলেও কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক ও জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষ। কৃষিপ্রধান এই এলাকার চাষিদেরও দুর্ভোগ কম নয়। নদ পার হয়ে কাছাকাছি বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় তাদের অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন খরচ বাড়ে। বিশেষ করে দ্রুত বাজারে পণ্য পৌঁছানোর প্রয়োজন হলে এই বাড়তি পথ তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে।
কালিয়াবকরী গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই তারা এই নদে সেতু নির্মাণের কথা শুনে আসছেন। কিন্তু এত দিনেও বাস্তবে কোনো সেতু না হওয়ায় তাদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। এবার ঢাকা থেকে জরিপ দল এসে মাপজোখ শুরু করায় তারা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য, সেতু নির্মিত হলে দুই গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং অসুস্থ রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশা করছেন। নদ পারাপারের দুর্ভোগের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াতও ব্যাহত হয়। দুলালনগর গ্রামের কয়েকজন স্কুলশিক্ষার্থী জানায়, বর্ষায় নদে পানি বেড়ে গেলে অনেক সময় নদ পার হওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে না। স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে এই সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে তাদের আশা। শিক্ষার্থীদের মতে, সেতু হলে শুধু স্কুলে যাতায়াত নয়, কোচিং, পরীক্ষা কিংবা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়াও সহজ হবে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পড়াশোনায় যে বিঘ্ন ঘটে, তা থেকেও তারা অনেকটা মুক্তি পাবে।
জরিপ দলের সদস্যরা জানান, সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজের অংশ হিসেবে নদটির দুই পাড়ের মাপজোখ এবং মাটি পরীক্ষার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপর নকশা ও বাজেট চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগোবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে দরপত্র আহ্বানের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
দামুড়হুদা উপজেলা প্রকৌশলী খালিদ হোসেন জানান, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জরিপের কাজ শেষ হলে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
দুলালনগর ও কালিয়াবকরী গ্রামের মানুষের কাছে ভৈরব নদের ওপর একটি সেতু কেবল নদ পারাপারের অবকাঠামো নয়, এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। মাপজোখ শুরুর মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপ এগিয়েছে। এখন তাদের অপেক্ষাÑকবে জরিপ ও নকশার কাজ শেষ হবে, কবে শুরু হবে নির্মাণকাজ, আর কবে ভৈরব নদের দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।


