দামুড়হুদা অফিস:
দামুড়হুদা উপজেলার ছোটদুধপাতিলা গ্রামে আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে সালিশে একটি হিন্দু পরিবারকে এক মাসের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে যায়ার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় ওই পরিবারের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগও উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন ছোটদুধপাতিলা গ্রামে গিয়ে ভুক্তভোগী হিন্দু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি তাদের সাহস দেন এবং ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ এবং ৫০ হাজার টাকা দেয়ার বিষয়টি উঠে এলে ইউএনও টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত সাইফুল ও মাহাবুলকে সঙ্গে নিয়ে সালিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আজ বুধবার সকাল ১০টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছোটদুধপাতিলা গ্রামের নস্কর আলীর মেয়ে এবং একই গ্রামের শ্রী শুদো হালদারের ছেলে শ্রী উজ্জল হালদারের মধ্যে সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে সম্প্রতি এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। দুজনেরই আগের সংসারে সন্তান রয়েছে। প্রায় এক বছর আগে উজ্জল হালদার হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম পরিবারের ওই নারীকে বিয়ে করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে এরপরও তিনি তার আগের হিন্দু স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশা অব্যাহত রাখেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের বিভিন্ন মহল্লায় ঘটনাটি নিয়ে নানা কথাবার্তা চলতে থাকে। একপর্যায়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য দফায় দফায় সালিস বৈঠকও হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ছোট্ট দুধপাতিলা গ্রামের মৃত ছলেমানের ছেলে সাইফুল ও ইব্রাহিমের ছেলে মাহাবুল উজ্জলের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা নেন। টাকা নেয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়। এরই মধ্যে গত রবিবার রাত ১২টার দিকে হাউলি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম এবং হাউলি ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ওবায়দুর হকের নেতৃত্বে একটি সালিস বৈঠক বসে। এতে গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সালিশে ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে হওয়া বিয়ের বিষয়টি অবমাননা করে তাদের নিজ নিজ ধর্মে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান। একই সঙ্গে শ্রী উজ্জল হালদারের পরিবারকে এক মাসের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয় বলে অভিযোগ। তবে ওই সালিসে আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা তালাকের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ ও হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে সংবাদপত্রে ঘটনাটি প্রকাশিত হলে প্রশাসনের নজরে আসে।
গতকাল মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে গিয়ে ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শ্রী উজ্জলের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলে ভুল করলে তার বিচার হোকÑএটি তারা মেনে নেবেন। কিন্তু সেই কারণে তাদের পরিবারকে ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা এবং গ্রাম ছাড়ার কথা বলা মেনে নেয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ভয়ভীতির কারণে তারা বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এরপর অসহায় হয়ে ইউএনওকে প্রশ্ন করেন, তাদের পরিবারকে যদি গ্রাম ছাড়তে হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবেন।
পরিবারটির কথা শুনে ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন বলেন, যে ঘটনায় হোক, তার বিচার হবে। তাই বলে পরিবারসহ বসতবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা যাবে না। তিনি টাকা নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে বলেন, যারা টাকা নিয়েছেন, তাদের সেই টাকা ফেরত দিতে হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকে সাহস দিয়ে ইউএনও বলেন, কেউ হুমকি-ধমকি দিলে আমাকে জানাবেন। আপনারা ভয় পাবেন না। তিনি আরও জানান, সালিস ও টাকা নেয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুধবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে ইউএনওর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হাউলি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, হাউলি ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ওবাইদুর হকসহ গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে, তা সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেয়া হলেও এর সঙ্গে পরিবারকে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ এবং টাকা নেয়ার অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর এখন ওই পরিবারের নিরাপত্তা ও অভিযোগগুলোর আইনগত নিষ্পত্তির দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা।


