পলিথিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সহজলভ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও পরিবেশের জন্য এর ক্ষতি কতটা ভয়াবহ, তা নিয়ে নতুন করে বলার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। অথচ আইন করে নিষিদ্ধ করার পরও চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় পলিথিনের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার থামছে না। সর্বশেষ সদর উপজেলার ৬ মাইল ও সরোজগঞ্জ এলাকায় উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৬৮ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দের ঘটনা আবারও সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। অভিযানটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ৬ মাইল এলাকার যুগিরহুদায় আই এম এস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতের দায়ে ১০ হাজার টাকা এবং সরোজগঞ্জ বাজারের মেসার্স আশাদুল স্টোরকে নিষিদ্ধ পলিথিন বিক্রি ও ব্যবহারের দায়ে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ৬৮ কেজি পলিথিন। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছেÑএটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কয়েকটি অভিযান ও কিছু জরিমানার মধ্য দিয়ে কি নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব? অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ পলিথিনের চাহিদা আছে বলেই এর উৎপাদন ও বিপণন চলছে। আবার উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ না হলে মানুষের হাতে এর সরবরাহও বন্ধ হবে না। ফলে উৎপাদক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীÑপুরো চক্রকেই নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পলিথিনের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি ব্যবহারের পর খুব দ্রুত বর্জ্যে পরিণত হয়, কিন্তু প্রকৃতিতে সহজে মিশে যায় না। নালা-নর্দমায় জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। খাল, ডোবা ও জলাশয়ে জমে পানি দূষিত করে। মাটির সঙ্গে মিশে কৃষিজমির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে। পলিথিন পুড়িয়ে ফেললেও বিপদ কমে না বরং বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ যে পলিথিন ব্যবহারের সময় আমাদের কাছে ‘সুবিধা’, সেটিই পরে সমাজ ও পরিবেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। চুয়াডাঙ্গার মতো জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ের বাজারগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার কমাতে তাই প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান জরুরি। তবে অভিযান হতে হবে ধারাবাহিক, দৃশ্যমান ও সমন্বিত। শুধু ছোট দোকান বা খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করলে হবে না, পলিথিন কোথা থেকে আসছে, কারা উৎপাদন করছে, কারা মজুত করছে এবং কোন পথে বাজারে ঢুকছেÑসেই উৎস শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই প্রতিষ্ঠান বারবার আইন ভাঙলে কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিকল্প প্যাকেজিংয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাজারে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ বা বিকল্প প্যাকেজিং সহজে ও সাশ্রয়ী দামে পাওয়া না গেলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাÑউভয় পক্ষকেই বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী সমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক প্রচার চালানো যেতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবেÑপলিথিনের ক্ষতি কোনো দূরের পরিবেশগত সমস্যা নয়, এর প্রভাব আমাদের বাড়ি, রাস্তা, নালা, কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর সরাসরি পড়ে। চুয়াডাঙ্গায় নিষিদ্ধ পলিথিনবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার যে ঘোষণা পরিবেশ অধিদপ্তর দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনের দৃঢ়তা দেখতে চায় মানুষ। অভিযান যেন কেবল জরিমানা আদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। একটি অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই যেন অবৈধ উৎপাদন বা বিক্রি আবার শুরু না হয়, সে জন্য নিয়মিত তদারকি ও ফলোআপ প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষা কোনো একক দপ্তরের দায়িত্ব নয়। এটি প্রশাসন, ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। অভিযানে ৬৮ কেজি পলিথিন জব্দ হয়েছে, আগামীকাল যেন আরও ৬৮০ কেজি জব্দ করার প্রয়োজন না পড়েÑসেই লক্ষ্যেই ব্যবস্থা নিতে হবে। নিষিদ্ধ পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চলুক, তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে পলিথিন উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের সুযোগই থাকবে না।


