আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰একক প্রস্তুতি জামায়াতের , এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার শঙ্কা📰দর্শনা-লোকনাথপুর সড়কে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ফেলে রাখায় রহস্য ঘনীভূত📰আলমডাঙ্গার প্রাপগপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দু’পক্ষের আহত ৭ 📰চুয়াডাঙ্গায় নজরুল উৎসবের পঞ্চম দিনে মঞ্চস্থ রিক্তের বেদন📰চুয়াডাঙ্গার ভান্ডারদহে গৃহবধূকে আহত করে সোনার চেইন ছিনতাই📰আলমডাঙ্গা পরোয়ানাভুক্ত নারীসহ ৪ জন গ্রেফতার, মাদক উদ্ধার📰দর্শনায় কাঠ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখমের অভিযোগ📰চুয়াডাঙ্গায় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভা অনুষ্ঠিত📰দামুড়হুদায় বুলডেজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো দুই অবৈধ ইটভাটা📰মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ১৪ বছরেও ফেরেননি গাংনীর নিখোঁজ চারজন
হোম পেজআইন আদালতফাইল হাতে ৩০ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় বিধবা রেহেনা, মিলছে না বিচার

চুয়াডাঙ্গায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত:

ফাইল হাতে ৩০ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় বিধবা রেহেনা, মিলছে না বিচার




বিশেষ প্রতিবেদক:

৩০ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা কোর্টের বারান্দায় ফাইল হাতে ঘুরছেন রেহেনা বেগম নামে এক বিধবা নারী। এত বছরেও তার দেওয়ানী মামলার কোন সুরাহা হয়নি। এখানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একটি ভবনে কোনরকমে চলছে বিচার কার্যক্রম। নেই চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন। রয়েছে বিচারক সঙ্কট। দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলা জটের কারণে বিচার প্রত্যাশী বাদী ও বিবাদী পক্ষের দুর্ভোগের শেষ নেই। অর্থিক ও সামাজিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।
আদালত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৬২নং আড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা রেহেনা বেগম। স্বামীর সাথে প্রায় ৩০ বছর ধরে কোর্টে আসতেন তিনি। দুই বছর আগে তার স্বামী মারা যায়। এরপর থেকে তিনি একাই কোর্টে আসেন দেওয়ানী মামলার কাজে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের ওহিদ ফরাজি নামের এক বৃদ্ধ ১৯৮৪ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত কোর্টের বারান্দায় ঘুরছেন। এরকম অসংখ্য মানুষ বিচারের আশায় ঘুরছেন বছরের পর বছর।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ১৮৯০ সালে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত আদালতগুলো। জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনস্ত সকল আদালতের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে একটি দোতলা ভবন ও ভবনের ছাদে ফাঁকা জায়গায় তৈরি করা জরাজীর্ণ কয়েকটি টিনশেডে। আদালতে সহকারী জজের ৪টি পদের ২টি, সহকারী পারিবারিক জজের ২টি পদের ২টি, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৩টি পদের ১টি ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৩ পদের মধ্যে ২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অধিনে ১১টি কোর্টে ১৩ হাজার ৭৬০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অপরদিকে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে বিচারাধীন রয়েছে ১৪ হাজার ৪৬১টি মামলা। বিচারক সঙ্কটসহ নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিনেও মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় জট বাড়ছে।
ভূক্তভোগীদের একজন বলেন, ১৭ বছর ধরে মামলা নিয়ে কোর্টে ঘুরছি বিচার ঠিকমত হচ্ছে না। আমি সরকারের কাছে দাবি করছি আমার এ মামলা দ্রুত শেষ করতে হবে। আমি গরীব মানুষ টাকার অভাবে মামলা চালাতে পারছি না। আমি সরকারের কাছি দাবি করছি আমার মামলাটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার করে শেষ করে এর একটি সমাধান দেয়া হোক।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের ওহিদ ফরাজি নামে এক বৃদ্ধ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিয়ে ঘুরছি। আমরা আমাদের বাপদের সাথে কোর্টে এসেছি, সে মামলার রায়ও পেয়েছি, সেই পার্টি আবারো মামলা করেছে, আমার বাপরা মারা গেছে, সেই মামলা এখনও আমরা চালাচ্ছি। কিন্তু বিচার আমরা সঠিকভাবে পাচ্ছিনা। আমরা চাষি মানুষ দিন মজুরী করে টাকা গুছিয়ে মামলার হাজিরা দিতে আসি, আবার মামলার দিন ঘুরে যায়। এভাবে আমরা মামলা নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে আছি, সঠিক বিচার পাচ্ছি না। ১৯৮৪ সাল থেকে মামলা চলছে, সেটি আজও চলমান রয়েছে। আল্লাহ ভালো জানেন এ মামলা কবে শেষ হবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৬২ নং আড়িয়া গ্রামের বিধবা রেহেনা বেগম জানান, স্বামীর সাথে ৩০ বছর ধরে কোর্টে আসতাম। দুই বছর আগে তার স্বামী মারা যায়। এরপর থেকে একাই কোর্টে আসছি মামলার কাজে। স্বামী ভ্যান-রিকসা চালাতো। আমি ঝাল-বেগুন তুলে মামলা চালায়। মামলা আমি আর চালাতে পারছি না। আমি একজন অসহায় বিধবা মহিলা। সরকারের কাছে দাবি আমার মামলাটা নিষ্পত্তি করে দেয়া হোক।
চুয়াডাঙ্গা জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট তুহিন আহম্মেদ বলেন, জেলায় প্রায় ২৮ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে, বিচারকের পদ অনেক শূন্য রয়েছে, পর্যাপ্ত সংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট না থাকার কারনে বিচারপ্রার্থী মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছে এবং আমরা আইনজীবীরাও ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছি। অনেক জেলাতে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন হলেও আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা এখন পর্যন্ত এ জেলাতে নতুন ম্যাজিস্ট্রেট ভবন পাইনি। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন চুয়াডাঙ্গার বিচার প্রার্থী জনগণ এবং আইনজীবীদের কথা ভেবে যতদ্রুত সম্ভব আমাদের এখানে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন নির্মাণ করা হোক।
চুয়াডাঙ্গা পৌর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাসিবুল ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ১৫ লক্ষ লোকের বসবাস। কিন্তু এখানে যে বিচারালয় রয়েছে তা খুবই সংকীর্ণ। এখানে টিন সেডে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়। এখানে প্রায় ২৩০ জন আইনজীবী রয়েছেন তাদের বসার মত ভাল কোন প্লেস নেই। চুয়াডাঙ্গায় বিচারক সংকট এবং আইনজীবীদের বসার মত কোন প্লেস না থাকায় বিচার প্রার্থীরা সঠিকভাবে বিচার পাচ্ছে না। চুয়াডাঙ্গায় মাজিস্ট্রেসি কোর্টটি যদি আলাদা হতো এবং বিচারক সংকট দূর হলে তাহলে মামলাগুলো খুবই দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হতো।
চুয়াডাঙ্গার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে আমার উপলদ্ধিতে যেটা আমি দেখছি চুয়াডাঙ্গাতে ২৮ হাজারের অধিক সংখ্যক দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কারণ এখানে প্রথমে রয়েছে তীব্র আকারে বিচারক সংকট। জেলার ৪টি উপজেলায় ৪টি দেওয়ানী আদালত রয়েছে। তার মধ্যে জীবননগর এবং দামুড়হুদার ২টি আদালতে কোন বিচারক নাই, সহকারী জজ পদ মর্যদার কোন বিচারক নাই, ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে চুয়াডাঙ্গা এবং আলমডাঙ্গার বিচারকরা দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে একটি মামলার তারিখ নির্ধারণ হয় আগামী ৫ থেকে ৬ মাস পরে। এভাবে ন্যায় বিচারতো হতেই পারে না। তাছাড়া দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও সম্ভব নয় বরং দিনকে দিন মামলার জট বাঁধছে। তার পরেও আমাদের এখানে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। আদালত চত্বরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ভবন নাই, ভবন না থাকার কারণে আজকে চুয়াডাঙ্গায় একই আদালত ভবনের ভিতরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের ম্যাজিস্ট্রেসি কোর্ট পরিচালনা করতে হয়। টিন সেডে বসেও সাব-জজ পদমর্যাদার বিচারকরা বিচার কাজ পরিচালনা করছেন, এভাবে কখনো আইনের সুষ্ঠু বিচার ও দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। এ অবস্থায় আমরা সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন মহলে আবেদন জানিয়েছি, তাগাদা দিয়েছি, আমরা বলেছি, অনুরোধ করেছি আশা করছি সেটি পাশ হবে। তার মধ্যেও আমাদের জন্য সুখবর হচ্ছে বর্তমান আইন মন্ত্রী আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন তিনি দ্রুততম সময়ে চুয়াডাঙ্গাতে চিফ জুডিসিয়াল আদলত ভবন নির্মাণ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। আর আইন মন্ত্রণালয় যদি বিষয়টি সদয়ভাবে দেখেন তাহলে আমাদের এই সমস্যা কিছুটা কাটবে। তা নাহলে মামলার জটে আমরা দূর্বিসহ অবস্থায় পড়ে যাব। সকলের কাছে আমাদের প্রার্থনা মামলার জট নিরসনের জন্য সঠিকভাবে বিচারক নিয়োগ এবং আদালত ভবন নির্মাণে যে অসুবিধা আছে সেটা দুর করে আমাদের বিচার ব্যবস্থা সুন্দর পথে অগ্রসর হোক।
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ ও বিচারকদের শুন্য পদ পূরণ করে মামলা নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে ৩০ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা কোর্টের বারান্দায় ফাইল হাতে ঘুরতে হবে না রেহেনা বেগমদের, এমন প্রত্যাশা ভূক্তভোগীদের।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ