আজ ,,
,

শিরোনামঃ
হোম পেজস্বাস্থ্যচুয়াডাঙ্গায় অপারেশনে রোগীর মৃত্যুতে ক্লিনিক সাময়িক বন্ধ, তদন্ত কমিটি গঠন 

চুয়াডাঙ্গায় অপারেশনে রোগীর মৃত্যুতে ক্লিনিক সাময়িক বন্ধ, তদন্ত কমিটি গঠন 




নিজস্ব প্রতিবেদক:

চুয়াডাঙ্গা শহরের উপশম নার্সিং হোমে পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লা (৪৮) নামে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, ক্লিনিক ভাঙচুর ও চিকিৎসক লাঞ্ছনার ঘটনায় নতুন করে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রোগীর মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কী-না, তা খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোমের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে চিকিৎসকের ওপর হামলা ও ক্লিনিকে ভাঙচুরের প্রতিবাদে ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। তবে সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা বিবেচনায় সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম চালু থাকবে।
গতকাল রবিবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে জেলা বিএমএর জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিএমএর দপ্তর সম্পাদক ডা. মো. মোহাইমিনুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ আলোচনার পর রাতে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছে। আজ সোমবার সকাল ছয়টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা জেলার সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকেরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস থেকে বিরত থাকবেন।
নিহত রবগুল মোল্লা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পদ্মবিলা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে। তিনি পেশায় কৃষক এবং স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। স্বজনদের ভাষ্য, পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রবগুল মোল্লাকে উপশম নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। শনিবার বিকেলে তাকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হয়। সেখানে ক্লিনিকের মালিক ও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এহসানুল হক তন্ময় অস্ত্রোপচার শুরু করেন। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক হিসেবে ছিলেন সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাইসুল ইসলাম জুয়েল। নিহতের বোন সাকিনা খাতুনের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের আগে তার ভাইকে কয়েকবার ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করার চেষ্টা করা হয়। পরে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের আচরণ তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেন এবং প্রয়োজনে রোগীকে অন্যত্র নেয়ার কথাও জানান।
সাকিনা খাতুনের দাবি, রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে দ্রুত জানাতে চিকিৎসকদের অনুরোধ করা হয়েছিল। তাহলে তারা অন্য হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতেন। স্বজনদের ধারণা, অস্ত্রোপচার চলাকালীনই রবগুল মোল্লার মৃত্যু হয়। সাকিনা খাতুন বলেন, আমার ভাই হাসতে হাসতে অপারেশনের রুমে গেল, একদম সুস্থ-সবল মানুষ। অপচিকিৎসায় আমার ভাইটাকে মেরে ফেললো। আমি তাদের বিচার চাই। স্বজনদের আরও অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে অপারেশন টেবিলেই রবগুল মোল্লার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর চিকিৎসকেরা তাকে অপারেশন থিয়েটারে রেখেই চলে যান বলেও তারা দাবি করেন। চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
অভিযোগের বিষয়ে চিকিৎসক এহসানুল হক তন্ময় বলেন, রোগীকে বাঁচানোর জন্য তারা অনেক চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যানেসথেসিয়ার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের পর রোগীর অবস্থা ও পাথর স্বজনদের দেখানো হয়েছিল। রোগীর আগে থেকেই কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক ডা. রাইসুল ইসলাম জুয়েলের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হয় তাতেও উত্তর পাওয়া যায়নি।
শনিবার বিকেলে রবগুল মোল্লার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উপশম নার্সিং হোম এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ স্বজনেরা দফায় দফায় ক্লিনিকে ভাঙচুর করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাটি সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে জেলা বিএমএর আহ্বায়ক ডা. আবু হাসানুজ্জামান নূপুর হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে বিএমএর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বাধা দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের বিষয়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
রবিবার জরুরি সভায় জেলা বিএমএ চারটি সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমত, নিহত রবগুল মোল্লার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। দ্বিতীয়ত, বিএমএর আহ্বায়ক ডা. আবু হাসানুজ্জামান নূপুরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং ক্লিনিকে ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। তৃতীয়ত, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ছয়টা থেকে ৪৮ ঘণ্টা জেলার সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে সরকারি হাসপাতালের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালু থাকবে। চতুর্থত, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিকিৎসকদের দাবিগুলো মানা না হলে পরবর্তী সভায় আরও কর্মসূচি নেয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা শহরের উপশম নার্সিং হোমে পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের সময় রোগী মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সাথে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়া পর্যন্ত ওই ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল রবিবার চুয়াডাঙ্গা জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উপশম নার্সিং হোমের অপারেশনে টেবিলে রোগী মৃত্যু ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করার জন্য ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। তারপর তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই তদন্ত কমিটিতে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালন্টে (সার্জারি) ডা. শ্যামল কুমার পালকে প্রধান করা হয়েছে। এই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. সাজিদ হাসান, সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি, জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. আফরোজা খাতুন।
অপরদিকে, রবগুল মোল্লার জানাজা গতকাল রবিবার সকাল ১০টার দিকে সুবদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং সংগঠনটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ