নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘দৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন’Ñএ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে স্মার্ট ও অ্যানালগ সাদাছড়ি বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণা বা সহানুভূতির চোখে না দেখে তাদের যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানানো হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টায় জেলা প্রশাসন, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র এবং প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোর যৌথ উদ্যোগে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে দিবসের আয়োজন শুরু হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদ চলাচল, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভা শেষে তাদের মধ্যে তিনটি স্মার্ট সাদাছড়ি ও পাঁচটি অ্যানালগ সাদাছড়ি বিতরণ করা হয়।
আলোচনা সভায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তালহা জুবায়েরের বক্তব্য উপস্থিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, ‘আমরাও সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। আমাদের প্রতিবন্ধী হিসেবে না ভেবে সাধারণ মানুষের মতো বিবেচনা করলে আমরা খুশি হই। আমাদের দৃষ্টিহীনতা আমাদের দুর্বলতা নয়।’ তালহার কথায় উঠে আসে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের আকাক্সক্ষা। তাদের পরিচয় যেন শুধু দৃষ্টিসীমার মধ্যে আটকে না থাকে, বরং তাদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়া হয়Ñএমন প্রত্যাশাই তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।
তালহার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিএম তারিক উজ-জামান। তিনি বলেন, আমি তালহার সঙ্গে একমত। আমরা তাদের সাধারণ একজন মানুষের চোখেই দেখব। তারা তাদের দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তাদের উপযোগী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা যেন নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর হতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা নিজেদের প্রতিভা ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের অন্য সদস্যদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি-অপারেশন আবু সাঈদ এবং জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হুমায়ুন কবির, বিভিন্ন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।
সাদাছড়ি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদে চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপকরণ। প্রচলিত অ্যানালগ সাদাছড়ির পাশাপাশি স্মার্ট সাদাছড়ি ব্যবহারের সুযোগ তাদের চলাচলে সহায়তা করতে পারে। তবে সহায়ক উপকরণের পাশাপাশি চলাচলের উপযোগী পরিবেশ, বাধামুক্ত পথ, সামাজিক সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। দিবসটির আয়োজনের মধ্য দিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আত্মমর্যাদা রক্ষা, নিরাপদ চলাচল এবং সমাজের মূলধারায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সহানুভূতির বদলে সম্মান, অবহেলার বদলে সহযোগিতা এবং সীমাবদ্ধতার বদলে সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়ার মানসিকতা গড়ে উঠলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণ সম্ভব হবে।
মেহেরপুর অফিস জানিয়েছে, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে মেহেরপুরে আলোচনা সভা, র্যালি ও স্মার্ট সাদাছড়ি বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। মেহেরপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামামুল হক ও টিআই আব্দুল হান্নান। স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা তুলসী কুমার পাল।
জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভা সঞ্চালনা করেন মেহেরপুর সরকারি শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক তৌফিকুল ইসলাম। ‘বৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন মেহেরপুর জেলা এনজিও সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন, পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হাবিবুর রহমান এবং বাউট বাধাগ্রস্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, সাদাছড়ি কেবল একটি লাঠি নয়, এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের কল্যাণে সরকারসহ সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের প্রতি করুণা নয়, বরং সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য শুধু দিবসটির অপেক্ষায় থাকলে চলবে না, সারাবছরই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
আলোচনা সভা শেষে ছয়জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে স্মার্ট সাদাছড়ি বিতরণ করা হয়। এর আগে দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের নেতৃত্বে র্যালিটি বাদ্যযন্ত্রের তালে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।
র্যালিতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পার্থ প্রতিম শীল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামামুল হক, জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা তুলসী কুমার পাল এবং জেলা এনজিও সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।


