মেহেরপুর থেকে নাছিম হাসান:
মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, দুই পাশে কাঁটাতারের বেড়া। ভৌগোলিক বিভাজন আর সীমান্তের বিধিনিষেধের কারণে জীবিত মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি দীর্ঘদিন। সেই মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে শেষবারের মতো মুখ দেখার আকুতি জেগেছিল মেয়ের মনে। অবশেষে সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে জন্মদাত্রী মায়ের নিথর মুখ দেখলেন বাংলাদেশের মেয়ে হাফিজা খাতুন। এ সময় তার চোখে ছিল মাকে হারানোর বেদনা, আর ছিল জীবিত থাকতে মায়ের কাছে যেতে না পারার আক্ষেপ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার নাজিরাকোনা সীমান্তের ১০৯ নম্বর প্রধান সীমান্ত পিলারের কাছে এ আবেগঘন ঘটনা ঘটে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)’র সদস্যদের উপস্থিতিতে মায়ের শেষ মুখ দেখার সুযোগ পান হাফিজা। মৃত ওই নারীর নাম জায়রা খাতুন (৭০)। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার গোবিন্দপুর গ্রামের মালিয়াপোতা পোস্ট এলাকায় বসবাস করতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিজ বাড়িতে শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, তার মেয়ে হাফিজা খাতুন ও জামাতা ফিকির আলী থাকেন বাংলাদেশের মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে। দুই দেশের সীমান্ত তাদের বসবাসের জায়গাকে আলাদা করে রেখেছিল। দূরত্ব খুব বেশি না হলেও মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমানা থাকায় মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি হাফিজার। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শেষবারের মতো মুখ দেখার আকাক্সক্ষা আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় সীমান্তের শূন্যরেখায় সেই সুযোগ তৈরি হয়। সকাল ১০টার দিকে ভারতের দিক থেকে জায়রা খাতুনের মরদেহ নাজিরাকোনা সীমান্তের ১০৯ নম্বর প্রধান পিলারের কাছে শূন্যরেখায় আনা হয়। সেখানে স্বামী ফিকির আলীকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন হাফিজা। সীমান্তের ওপারে থাকা মায়ের নিথর মুখ দেখে তাকে শেষবিদায় জানান তিনি। সেই মুহূর্তে সীমান্তের কাঁটাতার যেন মা-মেয়ের সম্পর্কের গভীরতার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। জীবিত অবস্থায় মায়ের কাছে যেতে না পারার আক্ষেপ আর চিরতরে হারানোর বেদনাÑদুইয়ের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে পরিবেশ। মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগটুকু পেলেও তাকে আর ছুঁয়ে দেখা কিংবা কাছে বসে বিদায় জানানোর সুযোগ ছিল না।
ঘটনাস্থলে বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবির মুজিবনগর নাজিরাকোনা বিওপির টহল কমান্ডার হাবিলদার শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পক্ষে বিএসএফের ইন্সপেক্টর এস কে রায়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় মা-মেয়ের এই শেষ দেখা। সীমান্তের নিয়ম ও ভৌগোলিক বিভাজনের মধ্যে মানবিক বিবেচনায় তৈরি হওয়া এই সুযোগ স্বজন হারানোর বেদনায় একটি পরিবারের কাছে হয়ে ওঠে শেষ বিদায়ের অবলম্বন। সীমান্ত সাধারণত দুই দেশের ভূখণ্ডকে আলাদা করে। কিন্তু মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার আকুতি কোনো সীমানায় আটকে থাকে না। নাজিরাকোনা সীমান্তের শূন্যরেখায় হাফিজা খাতুনের মায়ের শেষ মুখ দেখার ঘটনা সেই চিরন্তন সত্যকেই আবার সামনে নিয়ে এল।


