আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰একক প্রস্তুতি জামায়াতের , এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার শঙ্কা📰দর্শনা-লোকনাথপুর সড়কে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ফেলে রাখায় রহস্য ঘনীভূত📰আলমডাঙ্গার প্রাপগপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দু’পক্ষের আহত ৭ 📰চুয়াডাঙ্গায় নজরুল উৎসবের পঞ্চম দিনে মঞ্চস্থ রিক্তের বেদন📰চুয়াডাঙ্গার ভান্ডারদহে গৃহবধূকে আহত করে সোনার চেইন ছিনতাই📰আলমডাঙ্গা পরোয়ানাভুক্ত নারীসহ ৪ জন গ্রেফতার, মাদক উদ্ধার📰দর্শনায় কাঠ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখমের অভিযোগ📰চুয়াডাঙ্গায় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভা অনুষ্ঠিত📰দামুড়হুদায় বুলডেজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো দুই অবৈধ ইটভাটা📰মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ১৪ বছরেও ফেরেননি গাংনীর নিখোঁজ চারজন
হোম পেজদেশের খবরখুলনা বিভাগপাপড়ের ঝুড়ি কাঁধে নিয়েই স্বপ্নের পথে ১২ বছরের মিনহাজ

পাপড়ের ঝুড়ি কাঁধে নিয়েই স্বপ্নের পথে ১২ বছরের মিনহাজ




জীবননগর থেকে আকিমুল ইসলাম:

যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা নানা রঙের খেলনা, কাঁধে ঝোলার কথা বইভর্তি স্কুলব্যাগ, বিকেল নামলেই ছুটে যাওয়ার কথা খেলার মাঠেÑসেই বয়সেই ১২ বছরের মিনহাজের কাঁধে সংসারের ভার। সকালে স্কুলে যায় সে, আর ছুটি হলেই কাঁধে তুলে নেয় পাপড়ের ঝুড়ি। গ্রামের পথে পথে হেঁটে পাপড় বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে জ্বলে তাদের ঘরের চুলা। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের শিশু মিনহাজের দিন কাটে এভাবেই। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ের মাঝেও অবশ্য পড়াশোনার স্বপ্ন ছাড়েনি সে। বরং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তার চোখে বড় হওয়ার স্বপ্নÑলেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি করবে, মায়ের সব দুঃখ দূর করবে।
মিনহাজ যখন খুব ছোট, তখন তার বাবা শাপলা খাতুন ও দুই সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েন মা শাপলা খাতুন। সংসারের হাল ধরতে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করেন তিনি। মানুষের সহযোগিতায় কোনো রকমে চলতে থাকে তাদের সংসার। শুধু খাবারের কষ্টই নয়, নিরাপদ একটি ঘরের অভাবও ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। সামান্য বৃষ্টি হলেই টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ত ঘরের ভেতর। আবার রোদ উঠলে টিনের চালে অসহনীয় গরমে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ত। পরে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এগিয়ে আসেন। নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে টিন দিয়ে তাদের ছোট্ট ঘরটি মেরামত করে দেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়নি মিনহাজ। বর্তমানে সে মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সকালে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজলেই যেন তার জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু হয়। বই-খাতা গুছিয়ে মায়ের হাতে তৈরি পাপড়ের প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। গ্রামের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা পেরিয়ে পাশের এলাকাতেও যায়। হেঁটে হেঁটে পাপড় বিক্রি করে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত পর্যন্ত। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়েই এরপর ফিরে আসে বাড়িতে। মিনহাজের এই সংগ্রামের কথা অবশ্য দীর্ঘদিন জানতেন না তার বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও। প্রায় এক বছর আগে স্কুলের নাগরদোলায় খেলছিল মিনহাজ। তখন প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে তার কথা হয়। কথার একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, অভাবের কারণে শিশুটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি জানার পর মিনহাজকে নিজের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার উদ্যোগ নেন প্রধান শিক্ষিকা। শুধু ভর্তি করিয়েই থেমে থাকেননি, নিজের খরচে তার স্কুলের পোশাকও তৈরি করে দেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, মিনহাজ পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। ওকে সঠিকভাবে গাইডলাইন ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা করা গেলে সে ভবিষ্যতে অনেক ভালো কিছু করতে পারবে।
মিনহাজের মা শাপলা খাতুনের কণ্ঠে সন্তানের জন্য যেমন গর্ব, তেমনি দুশ্চিন্তাও। তিনি বলেন, যে বয়সে অন্য ছোট বাচ্চাদের খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে আমার ছেলেটা সংসারের জন্য পাপড় বিক্রি করে। ও অসুস্থ হয়ে একদিন কাজে যেতে না পারলে সেদিন আমাদের ঘরে খাবার জোটে না।
মায়ের এই কষ্টই যেন মিনহাজের স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করেছে। ছোট্ট এই শিশুটির চোখে ভবিষ্যতের একটি স্পষ্ট ছবি। সে লেখাপড়া শিখে বড় হতে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, সরকারি চাকরি করে মায়ের জীবনের কষ্ট দূর করা। মিনহাজ বলে, আমি লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সরকারি চাকরি করতে চাই, মায়ের সব দুঃখ দূর করতে চাই।
১২ বছরের মিনহাজের হাতে এখনো পাপড়ের প্যাকেট। কাঁধে এখনো সংসারের বোঝা। অথচ সেই ছোট্ট হাতেই লুকিয়ে আছে একটি বড় স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন তার মা। দারিদ্র্য যেন তার শৈশবটাকে ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে। স্কুলের পড়াশোনা আর জীবিকার সংগ্রামÑদুটিকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই তাকে পাড়ি দিতে হচ্ছে কঠিন পথ। তবু সে থামেনি। স্কুলে যায়, পড়াশোনা করে, আবার পাপড় বিক্রি করে মাকে সহযোগিতা করে। মিনহাজের মতো শিশুর স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন নয় এটি সমাজেরও দায়িত্বের জায়গা। সামান্য সহযোগিতা, শিক্ষার সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ পেলে হয়তো এই শিশুটিই একদিন নিজের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি বদলে দিতে পারবে মায়ের জীবনও।
এখন প্রশ্ন একটাইÑপাপড়ের ঝুড়ির ভার কি মিনহাজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেবে, নাকি সমাজের সহায়তার হাত তার কাঁধ থেকে সেই ভার কিছুটা নামিয়ে দেবে? উত্তরটি সময়ই দেবে। তবে আপাতত মিনহাজ প্রতিদিন স্কুলে যায়, বই খোলে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেÑআর স্কুল ছুটলেই কাঁধে পাপড়ের ঝুড়ি তুলে আবার নেমে পড়ে জীবনের কঠিন রাস্তায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ