আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰একক প্রস্তুতি জামায়াতের , এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার শঙ্কা📰দর্শনা-লোকনাথপুর সড়কে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ফেলে রাখায় রহস্য ঘনীভূত📰আলমডাঙ্গার প্রাপগপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দু’পক্ষের আহত ৭ 📰চুয়াডাঙ্গায় নজরুল উৎসবের পঞ্চম দিনে মঞ্চস্থ রিক্তের বেদন📰চুয়াডাঙ্গার ভান্ডারদহে গৃহবধূকে আহত করে সোনার চেইন ছিনতাই📰আলমডাঙ্গা পরোয়ানাভুক্ত নারীসহ ৪ জন গ্রেফতার, মাদক উদ্ধার📰দর্শনায় কাঠ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখমের অভিযোগ📰চুয়াডাঙ্গায় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভা অনুষ্ঠিত📰দামুড়হুদায় বুলডেজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো দুই অবৈধ ইটভাটা📰মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ১৪ বছরেও ফেরেননি গাংনীর নিখোঁজ চারজন
হোম পেজমতামতহাসান আলীর মৃত্যু আমাদের কী শেখায়

হাসান আলীর মৃত্যু আমাদের কী শেখায়




পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, স্বজনদের একটু ভালো রাখা আর ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার স্বপ্ন নিয়ে মানুষ ঘর ছাড়ে। কেউ পাড়ি জমান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, কেউবা জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দেন সুদূর বিদেশে। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ বিচ্ছেদ, কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা আর নিঃসঙ্গতা মেনে নিয়েও তারা বুকের মধ্যে লালন করেন একটিই স্বপ্নÑএকদিন দেশে ফিরবেন, আপনজনদের কাছে ফিরে নতুন করে জীবন সাজাবেন। কিন্তু সব স্বপ্নের পরিণতি সুখের হয় না। কোনো কোনো প্রত্যাবর্তন হয়ে ওঠে এক পরিবারের জন্য আজীবনের কান্না, আর সমাজের জন্য গভীর বেদনার এক নির্মম বার্তা। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কালিয়াবকরী গ্রামের হাসান আলী পুটুর জীবনের গল্প তেমনই এক মর্মস্পর্শী বাস্তবতা। পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ২৪ বছর আগে গ্রাম ছেড়ে আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ দুই যুগের প্রবাসজীবনে কঠোর পরিশ্রম করেছেন, অর্থ সঞ্চয় করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন দেশে ফিরে আপনজনদের নিয়ে নতুন করে সংসার গড়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। প্রায় এক সপ্তাহ আগে আফ্রিকায় আকস্মিক স্ট্রোকে তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার মরদেহ যখন নিজ বাড়িতে পৌঁছায়, তখন স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে ঠিকই, কিন্তু প্রিয় মানুষটির সঙ্গে মিলনের পরিবর্তে তাদের প্রস্তুতি নিতে হয় শেষ বিদায়ের। এই দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের লাখো প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, বিচ্ছেদ, ত্যাগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। যে মানুষটি একদিন পরিবারের সুখের জন্য ঘর ছেড়েছিলেন, তার শেষ ফেরা হলো নিথর দেহে। জীবনের দীর্ঘ ২৪টি বছর যাদের ভালো রাখার জন্য দূরে কাটিয়েছেন, তাদের অনেককেই জীবদ্দশায় শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাননি তিনি। মা-বাবাসহ পরিবারের অনেক আপনজনের শেষ বিদায়েও পাশে থাকতে পারেননি। প্রবাসের দূরত্ব তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল সেই সুযোগ। অথচ নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনিই ফিরলেন এমন এক বিদায় নিয়ে, যা কোনো পরিবারকে সহজে সান্ত্বনা দিতে পারে না। প্রবাসী মানুষের ত্যাগের মূল্যায়ন করতে গেলে আমরা প্রায়ই তাদের পাঠানো অর্থের হিসাব সামনে আনি। রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়ায়, অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। কিন্তু এই অর্থের পেছনে যে শ্রম, নিঃসঙ্গতা, স্বজনবিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি জমা থাকে, তার হিসাব কে রাখে? পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে কত মানুষ নিজের জীবনের আনন্দ, সন্তানের বেড়ে ওঠা, মা-বাবার শেষ বয়স কিংবা প্রিয়জনের বিপদের মুহূর্তগুলো থেকে দূরে থাকেনÑসেই বেদনা জাতীয় অর্থনীতির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। হাসান আলীর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সেই অদৃশ্য বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রবাসে একজন মানুষ শুধু শ্রম বিক্রি করেন না, তিনি নিজের জীবনের মূল্যবান সময়ও উৎসর্গ করেন। পরিবারের জন্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার ফলে দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে তার সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় থাকলেও শারীরিক উপস্থিতির অভাব পূরণ হয় না। মা-বাবার অসুস্থতা, পরিবারের আনন্দ-বেদনা কিংবা প্রিয়জনের শেষ বিদায়Ñকোনো কিছুতেই সময়মতো পৌঁছাতে না পারার যন্ত্রণা প্রবাসজীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। এ কারণেই প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনকে শুধু অর্থ উপার্জনের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং সংকটের সময়ে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। বিদেশে কোনো প্রবাসী অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় পড়লে কিংবা মারা গেলে তার পরিবার যেন অসহায় হয়ে না পড়ে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, কনস্যুলার সেবা এবং প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা জরুরি। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতা কমানো এবং শোকাহত পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত মানুষের অনেকেই কঠোর পরিশ্রম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবন কাটান। অসুস্থতা দেখা দিলে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ বা সামর্থ্য সব সময় তাদের থাকে না। আকস্মিক স্ট্রোকের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থা মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাসী কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও জোরদার হয়া দরকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশে যাওয়ার আগে এবং প্রবাসে অবস্থানকালে প্রত্যেক কর্মীর প্রয়োজনীয় নথিপত্র, নিয়োগকর্তার তথ্য, জরুরি যোগাযোগের নম্বর ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে পরিবার যাতে দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ কোনো মানুষের মৃত্যুকে ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তবে বিপদের সময়ে অসহায়ত্ব কমাতে এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে। হাসান আলীর জীবনের গল্পে একটি ব্যক্তিগত বেদনাও রয়েছেÑদেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও সেই ফেরা আর নিজের ইচ্ছায় হলো না। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর যে আকাক্সক্ষা তিনি লালন করেছিলেন, তা অপূর্ণই থেকে গেল। এই অপূর্ণতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সব স্বপ্নকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা যায় না। পরিবারের জন্য উপার্জন জরুরি, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোও জীবনের অপরিহার্য অংশ। অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি সম্পর্কের সান্নিধ্য, মানসিক শান্তি ও ব্যক্তিগত সুস্থতার গুরুত্বও সমানভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তবে প্রবাসে থাকা মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে দোষারোপ করে এই বেদনাকে ব্যাখ্যা করা অন্যায় হবে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরিবারের দায়িত্বই অনেককে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে বাধ্য করে। তাই প্রবাসীদের দ্রুত দেশে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং পরিবারসহ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ানো বেশি জরুরি। মানুষ যেন বাধ্য হয়ে স্বজনদের কাছ থেকে বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন না থাকে, সেই পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। হাসান আলীর পরিবারকে এই শোক বহন করতে হবে দীর্ঘদিন। কোনো সান্ত্বনাই প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবু তার মৃত্যু যেন কেবল একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিক, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ নন, তারা কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও বাবা, কারও ভাইÑএকটি পরিবারের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ