নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলার চলমান উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম, জনসেবার মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সার বিতরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক উজ জামান। কার্যবিবরণী পাঠ করেন সহকারী কমিশনার ফাহাদ চৌধুরী। সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের চলমান কার্যক্রম ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। আগের সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়।
সভায় জানানো হয়, জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা মরা ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছ দ্রুত কর্তন করে অপসারণ করা হবে। এসব গাছ ইতিমধ্যে বন বিভাগের মাধ্যমে নিলাম করা হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে গাছগুলো বিক্রি করা হবে বলে সভায় জানান জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র। তিনি বলেন, সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মরা গাছগুলো দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন। এতে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সভায় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পৌর প্রশাসক শারমিন আক্তার বলেন, জেলায় ডেঙ্গুর উপদ্রব বেড়েছে। এ কারণে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে, যাতে সেখানে মশার প্রজননস্থল তৈরি না হয়। তিনি আরও জানান, জেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে ফলজ ও একটি করে বনজ গাছ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে এবং মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, ডাবের খোসাসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সভায় পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা, জেলার বিভিন্ন খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। সভায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। হাসপাতালের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের রুট পারমিটের ব্যবস্থা এবং আইসিইউতে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। জেলা প্রশাসক বলেন, কয়েকদিন আগে সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেটআপ করা হয়েছে। সেখানে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিশ্চিত করা জরুরি। দামি এসব সরঞ্জাম যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, সদর হাসপাতালে মূলত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই তাদের চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালের পরিবেশের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে রোগী ও স্বজনদের ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনা দ্রুত পরিষ্কার করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। নিয়ম না মানলে জরিমানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক। তার মতে, কয়েক দিন এভাবে ব্যবস্থা নেয়া হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হতে পারে।
সভায় সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার উপশম নার্সিংহোমে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় আসে। চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, ওই ঘটনার পর নার্সিংহোমটির কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। এরপর বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে জেলার অন্য কোনো ক্লিনিকে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য ক্লিনিকগুলোতে তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
সভায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন জেলার যেসব ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে জানতে চান। জবাবে সিভিল সার্জন জানান, লাইসেন্স নবায়ন না করা ক্লিনিকগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়াকে অনেক ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট নরেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করছে। বিভিন্ন ক্লিনিকে পরিবেশগত ও অন্যান্য সমস্যা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র পাচ্ছে না। এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক মালিকদের।
সভায় জেলা প্রশাসক অবৈধভাবে পরিচালিত ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে পরিচালিত কোনো ক্লিনিককে ছাড় দেয়া যাবে না। সম্প্রতি উপশম নার্সিংহোমের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি ফোন করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এবং তার ডোপ টেস্ট করানোর দাবি জানিয়েছেন। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত নয় এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েÑএমন ক্লিনিক জেলায় প্রয়োজন নেই।
সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, জেলার সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসেবার মানোন্নয়ন এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো সমাধানে আরও সক্রিয় হতে হবে।
সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরের চলমান কার্যক্রম, আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। পরে বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক দীপক কুমার সাহা, জেলা তথ্য কর্মকর্তা শিল্পী মন্ডল, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাহাবুদ্দিন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান, টিটিসির অধ্যক্ষ মোছাব্বেরুজ্জামানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।


