মেহেরপুর অফিস:
বছর ঘুরে আবারও আসছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসবের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এরই মধ্যে মেহেরপুরে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। কোথাও মাটির কাজ শেষ করে প্রতিমাকে দেয়া হচ্ছে রংয়ের প্রলেপ, আবার কোথাও চলছে সাজসজ্জার শেষ কাজ। পূজার আয়োজন ঘিরে মন্দির ও মণ্ডপগুলোতেও বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। এবার ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। দেবীর বোধন ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এই উৎসব শেষ হবে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে। ইতিমধ্যে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রং-তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে দেবী দুর্গা, তার চার সন্তান সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা।
মেহেরপুরে এবার তিন উপজেলায় মোট ৪৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে মেহেরপুর সদর উপজেলায় ১৫টি, গাংনী উপজেলায় ২১টি এবং মুজিবনগর উপজেলায় ৮টি মণ্ডপ রয়েছে। সরেজমিনে বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা তৈরির মূল কাঠামো ও মাটির কাজ প্রায় শেষ। কোনো কোনো মণ্ডপে প্রতিমায় রং করার কাজ চলছে। শিল্পীরা নিখুঁতভাবে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবীর মুখাবয়ব, অলংকার ও পোশাকের নকশা। পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, প্রতিবছর ভক্তদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আসেন দেবী দুর্গা। এবার দেবীর আগমন ঘোটকে এবং গমন হবে নৌকায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোটকে দেবীর আগমনকে কিছুটা অশুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়। এতে ফল-ফসল ও শস্যে বসুন্ধরা পরিপূর্ণ হওয়ার বিশ্বাস রয়েছে ভক্তদের মধ্যে।
উৎসবকে ঘিরে এরই মধ্যে নতুন পোশাক কেনাকাটা, বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ নানা প্রস্তুতি শুরু করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতিবছরের মতো এবারও আনন্দ, উৎসাহ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা তাদের।
মেহেরপুর পৌর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ সাহা বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। এখন রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। দুর্গোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কালীবাড়ি মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুভাষ রায় বলেন, প্রতিমাগুলোতে এখন রং ও সাজসজ্জার কাজ করা হবে। দুর্গোৎসবের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করবেন তারা। মেহেরপুর শহরের কালীমন্দিরের পুরোহিত শ্রী তপন কুমার ব্যানার্জী বলেন, এবার দেবীর আগমন ঘোটকে এবং গমন নৌকায়। নৌকায় গমনের সঙ্গে ফল-ফসল ও শস্যে বসুন্ধরা পূর্ণ হওয়ার বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। দেবীর আগমন শুভ না হলেও সবাই মিলে প্রার্থনা করবেন, যাতে সব অশুভ দূর হয়ে মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
নায়েববাড়ি মন্দিরের পুরোহিত অধর চৈতন্য দাস বলেন, দুর্গোৎসবকে ঘিরে তারা সবাই মিলে শান্তি ও মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করবেন। দেবীর আশীর্বাদে সমাজ থেকে সব অশুভ দূর হবেÑএটাই তাদের প্রত্যাশা। জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শ্রী মাধব চন্দ্র ভাস্কর বলেন, জেলার প্রতিটি মন্দিরে প্রতিমা তৈরির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখন মূলত রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সহযোগিতা করছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপন করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড়, মণ্ডপে সাজসজ্জার ব্যস্ততা আর উৎসবের অপেক্ষাÑসব মিলিয়ে মেহেরপুরে এখন শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ। দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন ভক্তরা। তাদের প্রার্থনা একটাইÑউৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে, দূর হোক অশুভ, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও মঙ্গল।


