কৃষির সম্ভাবনা শুধু ধান, পাট, গম কিংবা প্রচলিত সবজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, বাজারের চাহিদা ও কৃষির ধরন। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ফসলের সন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে দুই তরুণের হাত ধরে সাম্মাম চাষের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা এ অঞ্চলের কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে জসিম হোসেন ও রাজিব হাসান দেড় বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সাম্মাম চাষ শুরু করেছিলেন। বিদেশি এই ফলের বাজার কেমন হবে, ফলন কতটা হবে কিংবা চাষ করে আদৌ লাভ করা যাবে কি নাÑএসব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় ছিল। কিন্তু প্রথম চাষেই সেই সংশয় অনেকটা দূর হয়েছে। প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে চাষ করে ইতোমধ্যে চার লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন তাঁরা। বাগানে থাকা ফল থেকে আরও প্রায় তিন লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন। অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার থাকলে স্বল্প সময়ে এই ফসল কৃষকের জন্য ভালো আয়ের উৎস হতে পারে। এখানেই এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি নিহিত। কৃষিতে নতুন কিছু করার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন দুই তরুণ। তাদের সাফল্য এখন আশপাশের কৃষকদেরও প্রচলিত ফসলের বাইরে ভাবতে উৎসাহিত করছে। জীবননগর ও চুয়াডাঙ্গা এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বিঘা জমিতে সাম্মাম বা রকমেলন চাষ হচ্ছে বলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার তথ্য থেকে জানা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে সম্ভাবনার একটি বড় ইঙ্গিত। সাম্মাম চাষের আরেকটি আকর্ষণ এর তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদনচক্র। বীজ বপনের প্রায় ৩০ দিনের মধ্যে ফুল আসে, কৃত্রিম পরাগায়নের ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফল ধরতে শুরু করে এবং প্রায় তিন মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব। প্রতি কেজি প্রায় ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলে তিন-চার কেজি ওজনের একটি ফলের দাম দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। ফলে কৃষকের কাছে এর অর্থনৈতিক আকর্ষণ সহজেই বোঝা যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কৌতূহল ও আগ্রহ তৈরি হওয়ায় নতুন ফলটির বাজার তৈরির সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। তবে এখানেই আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কোনো নতুন ফসলের প্রাথমিক সাফল্য দেখেই ব্যাপকভাবে চাষে নেমে পড়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি সম্ভাবনাময় একটি ফসলকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়া কৃষকের ওপর ছেড়ে দেয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যেতে পারে। রোগবালাই, বীজের মান, উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণÑসবকিছুর ওপর নির্ভর করবে এই ফসলের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য। তাই কৃষি বিভাগকে এখনই সাম্মাম চাষ নিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। কোন জাত এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার জন্য উপযোগী, প্রতি বিঘায় উৎপাদন কত, খরচ ও লাভের প্রকৃত হিসাব কী, কী ধরনের মাচা ও সেচব্যবস্থা প্রয়োজন, রোগবালাই মোকাবিলায় কী করতে হবেÑএসব বিষয়ে কৃষকদের হাতে সহজবোধ্য প্রযুক্তিগত নির্দেশনা পৌঁছে দিতে হবে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসম্মত বীজের নিশ্চয়তা এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শও জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারব্যবস্থা। কৃষক উৎপাদন করবেন, কিন্তু ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পারলে নতুন ফসলের প্রতি আগ্রহ দ্রুত কমে যাবে। তাই স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সুপারশপ, ফলের আড়ত, অনলাইন বিপণন ও বড় শহরের বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তা ও কৃষকদের সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কৃষিভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনাও এখানে বিবেচনা করা যেতে পারে। জীবননগরের সাম্মাম বাগানে মানুষের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে কৃষকের অতিরিক্ত আয়ও হতে পারে। জসিম ও রাজিবের উদ্যোগ আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়Ñকৃষির ভবিষ্যৎ শুধু জমিতে নয়, কৃষকের চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের মধ্যেও নিহিত। প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবহার করে তরুণেরা যদি নতুন ফসল, নতুন পদ্ধতি ও নতুন বাজার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, তাহলে কৃষি শুধু জীবিকা নয়, উদ্যোক্তা তৈরিরও বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। মরুভূমি বা মধ্যপ্রাচ্যের ফল হিসেবে পরিচিত সাম্মাম আজ জীবননগরের মাটিতে ফলছে। এটি নিছক একটি বিদেশি ফলের স্থানীয় উৎপাদন নয়; বরং কৃষিতে বৈচিত্র্য, তরুণ উদ্যোক্তা এবং নতুন বাজারের সম্ভাবনার প্রতীক। এখন প্রয়োজন এই সম্ভাবনাকে বিচ্ছিন্ন সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার ও সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে একটি টেকসই কৃষি উদ্যোগে পরিণত করা। তাহলেই জীবননগরের সাম্মাম শুধু বাগানে ঝুলবে নাÑএ অঞ্চলের কৃষকের আয় ও স্বপ্নেও নতুন রঙ ছড়াবে।


