নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গার পূজামণ্ডপগুলো। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। দেবীর সামনে প্রার্থনায় নত হচ্ছেন ভক্তরা। কারও হাতে ফুল, কেউ অপেক্ষায় পুষ্পাঞ্জলির। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল শনিবার সকাল থেকে জেলার ১১৬টি মণ্ডপে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাসপ্তমীর পূজা। সকাল সাতটা থেকে বিভিন্ন মণ্ডপে শুরু হয় সপ্তমীর ধর্মীয় আচার। এর মধ্যে ছিল নবপত্রিকা স্থাপন, দেবীর মহাস্নান ও পুষ্পাঞ্জলি। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি উৎসবের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা স্থাপন, যা সাধারণভাবে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। এদিন সকালে কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে মণ্ডপে স্থাপন করা হয় নবপত্রিকা। নয়টি উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত এই নবপত্রিকাকে দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কও প্রতিফলিত হয়। নবপত্রিকা স্থাপনের পর বিভিন্ন মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় পুষ্পাঞ্জলি। ভক্তরা ফুল হাতে দেবীর চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কোথাও পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে, কোথাও ঢাকের তালে ভক্তিময় পরিবেশ তৈরি হয়। দেবীর কাছে তাদের প্রার্থনাÑপৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানুষের মধ্যে সংহতি ও সম্প্রীতি এবং সবার কল্যাণ। মহাসপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার দেবীর মহাস্নান। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারে দেবীর স্নান সম্পন্ন করা হয়। এই আচারকে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
পূজাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, মহাসপ্তমীর তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং মানুষের মধ্যে সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা। অন্যের অধিকার রক্ষা, অহংকার ও বৈষম্য পরিহার, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে। মহাসপ্তমীর পূজা উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গামন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপে ছিল ভক্তদের উপস্থিতি। বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সহকারী পুরোহিত উত্তম কুমার চক্রবর্তী বলেন, সকালে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্নানের মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দেবীর চক্ষুদান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সপ্তমীর পূজার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
পূজায় অংশ নিতে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রাপ্প কুমার কর্মকার বলেন, মহাসপ্তমীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিটি নাগরিক কোনো ধরনের ভয় ছাড়াই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন। এবারের পূজায় অনেক আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যে আছি। অর্পিতা বিশ্বাস বলেন, ঢাকিদের ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে যাবে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, প্রকৃতির প্রতি যত্ন এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা যেন নাগরিক আচরণে সব সময় জাগ্রত থাকে। এটাই মহাসপ্তমীর মূল অঙ্গীকার।
মহাসপ্তমীর পূজাকে ঘিরে জেলার মণ্ডপগুলোতে দিনভর ছিল ভক্তদের আনাগোনা। দেবী দর্শন, প্রার্থনা ও পুষ্পাঞ্জলির পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দিচ্ছেন অনেকে। ধর্মীয় আচার আর সাংস্কৃতিক আবহ মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে মণ্ডপে মণ্ডপে।


