নিজস্ব প্রতিবেদক:
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষাসৈনিক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রমিক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তার অবদানের কথা স্মরণ করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মোহাম্মদ শাহজাহানের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে মোহাম্মদ শাহজাহান স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সেলিম উদ্দিন খান। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন জেলা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলÑজাসদ (ইনু)’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকসিজুল ইসলাম রতন। এরপর মোহাম্মদ শাহজাহানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে তার আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, মোহাম্মদ শাহজাহান শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের একজন নিবেদিত সংগঠক। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার দৃষ্টান্ত। দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার আদর্শ ধারণ করে মানুষের অধিকার রক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জানা গেছে, মোহাম্মদ শাহজাহান ১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর আকস্মিক হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা যান। চুয়াডাঙ্গার এই কৃতী সন্তান জাতীয় শ্রমিক লীগ ও জাতীয় শ্রমিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্যকরী কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলমডাঙ্গা-চুয়াডাঙ্গা নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তার এ ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রমিকনেতা হিসেবেও তার পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছিল। ১৯৭২ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তিনি। পরে ১৯৭৮ সালে ইতালির তুরিন থেকে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আইএলও ফেলোশিপ অর্জন করেন।
স্মরণসভায় স্মৃতিচারণা করেন মোহাম্মদ শাহজাহানের সহোদর ও জেএসডির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি তৌহিদ হোসেন, জেলা জাসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. সবেদ আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবেছ উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল আরেফিন, আলমডাঙ্গা উপজেলা জাসদের নেতা মোল্লা গোলাম সরোয়ার, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খন্দকার অহিদুল আলম (মানি খন্দকার), চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি ও বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হুসাইন মালিক। এছাড়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শামীম রেজা ডালিম, দর্শনা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রেজাউল করিম, চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বিশ্বাস, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আলাউদ্দীন, বিপ্লবী গণফ্রন্টের জেলা আহ্বায়ক লিটু বিশ্বাস, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিজানুল হক মিজান, উদীচী জেলা সংসদের সভাপতি হাবিবি জহির রায়হান, কবিয়াল এসকান্দার, নারী উদ্যোক্তা জাহানারা খাতুন টগর, লেখক জহির রায়হান, রেজওয়ানুর রহমান মিলন ও জেএসডির নেতা লাবলুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভা সঞ্চালনা করেন প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক কাজল মাহমুদ।
এদিকে মোহাম্মদ শাহজাহানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলÑজেএসডি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।


