নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় আয়োজিত সেমিনারে। বক্তারা বলেছেন, নজরুল কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠারও পথপ্রদর্শক। তার সাহিত্যকর্মে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের আকাক্সক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে শক্তি রয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নজরুল বর্ষ পালন উপলক্ষে জেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা ও সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মুন্সি আবু সাইফ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। সঞ্চালনা করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার।
মূল প্রবন্ধে ড. মুন্সি আবু সাইফ বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা। কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও স্বাধীনতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সব যুগের মানুষের কাছে এর আবেদন রয়েছে। নজরুলের সাহিত্যকর্মে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার যে দর্শন নজরুল তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান সময়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। তার বিদ্রোহ ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে, আর তার মানবতাবাদী চেতনা মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করার প্রেরণা জুগিয়েছে। ড. মুন্সি আবু সাইফ আরও বলেন, নজরুল বর্ষ পালন শুধু জাতীয় কবিকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি তার জীবন, সাহিত্য, দর্শন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তরুণদের মধ্যে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রতিবাদী মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে হবে। তার সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়ানোর সাহস এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা পেতে পারে। নজরুলকে যথাযথভাবে জানতে হলে তার কবিতা ও গান পাঠের পাশাপাশি তার চিন্তা, দর্শন এবং সমাজ পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাও অনুধাবন করতে হবে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। এ জন্য আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গবেষণার মাধ্যমে নজরুলের সাহিত্যকর্ম আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, নজরুলের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ বাস্তব জীবনে ধারণ করতে পারলেই তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে। তার সাহিত্য ও দর্শন আগামী প্রজন্মকে মানবিক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করবে।
সেমিনারে জানানো হয়, সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সারা দেশে নজরুল বর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় কবির দর্শন, সৃষ্টিকর্ম ও সাংস্কৃতিক চেতনা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নেজারত ডেপুটি কালেক্টরেট মির্জা শহিদুল ইসলাম, জেলা কালচারাল অফিসার সাইফুল হাসান মিলন, জেলা জাসাসের সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


