আজ ,,
,

শিরোনামঃ
হোম পেজদেশের খবরখুলনা বিভাগইতালি পাঠানোর নামে লিবিয়ায় জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ

ইতালি পাঠানোর নামে লিবিয়ায় জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ




গাংনী অফিস:

মেহেরপুরের গাংনীতে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে যুবকদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি, নির্যাতন এবং স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে আব্দুল জব্বার নামের এক সাবেক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইতালি পৌঁছে দেয়ার কথা বলে তাদের বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নেয়া হয়। পরে সেখানে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দিয়ে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এ ঘটনায় মেহেরপুর আদালতে দুটি মামলা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আব্দুল জব্বার গাংনী উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং এলেঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। আদালতে দায়ের করা মামলার নথি, বাদী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার নথি ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এ চক্রের শিকার হয়েছেন এলেঙ্গী গ্রামের সামসুল আলম ও সালদহ গ্রামের মামুনুর রশীদ। তাদের দুজনের কাছ থেকেই ইতালি পাঠানোর কথা বলে বিপুল অঙ্কের টাকা নেয়া হয়। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটে। মামলার নথি অনুযায়ী, এলেঙ্গী গ্রামের সামসুল আলমকে ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাসে দেশ ছাড়েন তিনি। তবে সরাসরি ইতালি না নিয়ে তাকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, দুবাই, সুদান ও মিসর ঘুরিয়ে নেয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে একটি জানালাবিহীন কক্ষে আটকে রাখার পর ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামসুলের স্ত্রী পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, লিবিয়ায় স্বামীকে পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হতো। কখনো তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে ফেলার ভয়াবহ দৃশ্য দেখানো হতো। এসব নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি পাঠিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পারভীনার দাবি, আব্দুল জব্বার ও তার স্ত্রী লিপা খাতুনের নির্দেশে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৬ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। স্বামীকে মুক্ত করতে গিয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত নিজের ভিটেমাটিও বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন জিম্মি থাকার পর ২০২৫ সালের মে মাসে সামসুল সেখান থেকে পালিয়ে ইতালিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু এরপর থেকে প্রায় এক বছর ধরে তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে পারভীনা জানতে পেরেছেন, তার স্বামী ইতালির রোমের একটি কারাগারে আটক রয়েছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন গাংনীর সালদহ গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক মামুনুর রশীদ। তার অভিযোগ, ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে তাকে লিবিয়ায় নেয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। মামুনুর রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করার ভয়াবহ দৃশ্য ধারণ করে তা পরিবারের সদস্যদের দেখানো হয়। এরপর তার পরিবারসহ আরও দুটি পরিবারের কাছে মোট ৯০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একপর্যায়ে তিনি কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মরুভূমি অতিক্রম করে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা নিয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন। তবে দেশে ফিরতে তাকে আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
মামুনুর রশীদ ও স্থানীয় ইউপি সদস্য শামীমের অভিযোগ, শুধু সামসুল ও মামুন নন, তুহিন ও বাদশাসহ আরও কয়েকজন একই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ইউপি সদস্য শামীম বলেন, এলাকায় একটি দালালচক্র গড়ে উঠেছে। সামসুলসহ আশপাশের এলাকার সাত-আটজনকে লিবিয়ায় আটকে রেখে তাদের পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য রয়েছে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তবে আব্দুল জব্বারের ছোট ভাই আকুব্বার ও স্ত্রী লিপা খাতুন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, জব্বার মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি শুধু সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। লিপা খাতুন বলেন, তিনি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি। তার ব্যাংক কিংবা বিকাশ হিসাবেও কারও টাকা জমা হয়নি। পুলিশের তদন্তেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আব্দুল জব্বারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। টানা দুই সপ্তাহ ধরে তার মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে, মামলার তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাদীপক্ষ। মামুনুর রশীদ ও পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, মামলার এজাহার এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টে লিপা খাতুনের নামে টাকা জমা হওয়ার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। এরপরও তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে লিপা খাতুন ও জব্বারের ভাই মান্নানের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) অতুল জোয়ারদার। তিনি বলেন, বিধি মেনেই তদন্ত করা হয়েছে। কারও ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হলেই তিনি মামলার আসামি হয়ে যান না। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে।
গাংনী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাদ্দিদ মোর্শেদ বলেন, বিদেশে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন এবং মুক্তিপণ দাবি করার মতো ঘটনা মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনের আওতায় পড়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট না হলে আদালতে নারাজি পিটিশন দিতে পারেন। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় জিম্মি হওয়া, নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং স্বজনদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের এসব অভিযোগ স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক, যাতে বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে আর কোনো পরিবারকে এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে না হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ