আজ ,,
,

শিরোনামঃ
হোম পেজদেশের খবরখুলনা বিভাগইতালি যাওয়ার স্বপ্নে সর্বস্বান্ত আলমডাঙ্গার পাঁচ পরিবার, ১০ মাস লিবিয়ায় বন্দিজীবন

ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে সর্বস্বান্ত আলমডাঙ্গার পাঁচ পরিবার, ১০ মাস লিবিয়ায় বন্দিজীবন




আলমডাঙ্গা থেকে তানভীর সোহেল:

ইতালিতে গিয়ে ভালো বেতনে কাজ করে পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। সেই স্বপ্ন পূরণে জমি বন্ধক রেখেছেন, গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছেন। কেউ নিয়েছেন ঋণ, কেউ ছেড়েছেন চাকরি, কেউবা বন্ধ করেছেন পড়াশোনা। কিন্তু ইতালির পরিবর্তে তাদের ঠাঁই হয় লিবিয়ার বন্দিশালায়। সেখানে ১০ মাস ধরে চলে নির্যাতন, আর পরিবারের কাছে ফোন করিয়ে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত সাগরপথে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরেছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার পাঁচ ব্যক্তি। তবে প্রাণে বাঁচলেও হারিয়েছেন তাদের সঞ্চয়, সম্পদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থ্য।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দফায় মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করেছে মানবপাচারকারী চক্র। অথচ এত টাকা দিয়েও ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি তারা। দেশে ফিরে এখন ঋণের বোঝা, আর্থিক সংকট ও শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটছে পাঁচটি পরিবারের। সরেজমিনে আলমডাঙ্গা উপজেলার ফুলবগাদী, নিমতলা ও বড়গাংনী গ্রামে গিয়ে জানা যায়, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা হলেন ফুলবগাদী গ্রামের জাহিদ হাসান (৫০), কামরুল ইসলাম (৪২) ও জাহিদুল ইসলাম (২১), নিমতলা গ্রামের আলিফ (২১) এবং বড়গাংনী গ্রামের ছাব্বির আলী। তাদের প্রত্যেকেরই বিদেশে গিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় জীবনের জমানো সব সম্পদ হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব।
ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিমতলা গ্রামের মসজিদপাড়ার চায়ের দোকানি আসাদুল, এলাকায় যিনি ‘আপানুর’ নামে পরিচিত। তার ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউসের মাধ্যমে পাঁচ পরিবারের কাছে ইতালি যাওয়ার প্রস্তাব পৌঁছায়। মোহাম্মদ আলী হাউস বিদেশে থাকায় তার দেয়া প্রস্তাবকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছিলেন তারা। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ইতালিতে পৌঁছাতে পারলে মাসে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এই আশ্বাসে রাজি হয়ে পরিবারের সদস্যরা অর্থ জোগাড়ে নেমে পড়েন। কেউ জমি বন্ধক রাখেন, কেউ গবাদিপশু বিক্রি করেন, কেউ স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেন। আবার কেউ এনজিও থেকে ঋণ নেন। চুক্তি অনুযায়ী, যাওয়ার আগে অর্ধেক এবং ইতালিতে পৌঁছানোর পর বাকি টাকা দেয়ার কথা ছিল। তবে সরাসরি ইতালি নেয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের নেয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের পাসপোর্ট, মুঠোফোন ও ভিসাসংক্রান্ত কাগজপত্র কেড়ে নেয়া হয়। বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আরও ৫৭ জনের সঙ্গে একটি ঘরে আটকে রাখা হয় তাদের। এরপর শুরু হয় নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের চাপ। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, তাদের একজনকে অন্য ঘরে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোন করতে বাধ্য করা হতো। সেই ফোনে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হতো। পরিবার টাকা দিতে রাজি না হলে বন্দিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। নির্যাতনের মধ্যেই স্বজনদের কাছে ফোন করে টাকা চাইতে বাধ্য করা হতো তাদের। এভাবে বিভিন্ন দফায় পাঁচজনের পরিবারের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অর্থ আদায়ের পরও ইতালিতে পৌঁছানোর সুযোগ হয়নি তাদের। একপর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার জন্য টিউব দিয়ে তৈরি একটি নৌকায় তাদের তুলে দেয়া হয়। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকার টিউব ফুটো হয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে সেখানে কোস্টগার্ডের সদস্যরা পৌঁছে তাদের উদ্ধার করেন। পরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক হয়ে বিদেশের কারাগারে যেতে হয় তাদের। সেখান থেকে মুক্তি পেতেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। শেষ পর্যন্ত অন্য এক দালালের সহযোগিতা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় প্রায় ১০ মাস পর দেশে ফিরতে সক্ষম হন তারা। তবে দেশে ফিরেও স্বস্তি মেলেনি। নিজেদের দেয়া টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী হাউস টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলেও দাবি তাদের।
২৯ লাখ টাকা হারিয়ে অসহায় জাহিদ ফুলবগাদী গ্রামের মসজিদপাড়ার বাসিন্দা মরহুম খোদ বক্সের ছেলে জাহিদ হাসানের বয়স ৫০ বছর। একসময় তার ছিল ৩০০ ভেড়ার খামার ও জমি চাষের ট্রাক্টর। ১২ বছর কুয়েতে কাটিয়ে দেশে ফিরে গড়ে তুলেছিলেন স্বচ্ছল জীবন। কিন্তু বিদেশে আরও ভালো আয়ের আশায় সেই সম্পদ বিক্রি করে আবারও বিদেশযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জাহিদ হাসান বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কয়েকজনের সঙ্গে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি। এ জন্য দালালদের হাতে তুলে দেন ২৯ লাখ টাকা। কিন্তু ইতালির পরিবর্তে লিবিয়ায় বন্দি হয়ে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। প্রায় ১০ মাস পর দেশে ফিরে এখন আর আগের মতো কাজ করার সামর্থ্য নেই তার। শরীরের অসুস্থতা ও নির্যাতনের যন্ত্রণা নিয়ে দিনের বড় একটি সময় ঘুমিয়ে কাটে। একসময় স্বচ্ছল জীবন থাকলেও এখন তিনি অসহায়।
৩২ লাখ টাকা দিয়েও পূরণ হয়নি স্বপ্ন একই গ্রামের আইজউদ্দিনের ছেলে কামরুল ইসলামের বয়স ৪২ বছর। তারও ছিল ৬০টি ভেড়ার খামার ও গোয়ালে ১২টি গরু। ইতালি যাওয়ার আশায় সেসব বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি ঋণ নিয়েছেন এবং জমি বর্গা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে দালালদের ৩২ লাখ টাকা দিয়েও স্বপ্নের ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি। কামরুল ইসলাম বলেন, সংসারের আর্থিক অবস্থা ভালো করার আশায় বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন সম্পদ হারিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতে হচ্ছে। যে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন, তা পূরণ হয়নি বরং পরিবারকে আরও সংকটে ফেলেছেন।
৩৪ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব ২১ বছরের যুবক ফুলবগাদী গ্রামের সাহেব আলীর ছেলে জাহিদুল ইসলামের বয়স মাত্র ২১ বছর। বাড়িতে গরু-ছাগল পালন ও সেগুলো বিক্রি করে ভালোই চলছিল তার জীবন। বিদেশে গিয়ে আরও ভালো কিছু করার আশায় দালালের প্রস্তাবে রাজি হন। পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে দালালদের হাতে তুলে দেন ৩৪ লাখ টাকা। কিন্তু লিবিয়ায় বন্দিজীবন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। জাহিদুল ইসলামের ভাষ্য, বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। এখন সেই স্বপ্নের সঙ্গে হারিয়েছেন পরিবারের জমানো সব সম্পদ। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।
সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে এখন নিঃস্ব আলিফ নিমতলা গ্রামের এনামুলের ছেলে আলিফের বয়স ২১ বছর। তিনি আগে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ইতালিতে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে সেই চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর দালালদের হাতে তুলে দেন ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু ইতালি যাওয়া তো দূরের কথা, লিবিয়ায় বন্দি হয়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। দেশে ফিরে এখন চাকরি নেই, হারিয়েছেন জমানো অর্থও। যে উন্নত জীবনের আশায় চাকরি ছেড়েছিলেন, সেই স্বপ্ন এখন তার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড়গাংনী গ্রামের সাদ আহম্মদের ছেলে ছাব্বির আলী চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সরকারি কলেজের ইসলামী ইতিহাস বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করার আশায় পড়াশোনা বন্ধ রেখে দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ জন্য দালালদের হাতে তুলে দেন ২২ লাখ টাকা। কিন্তু অন্যদের মতো তাকেও লিবিয়ায় বন্দি হয়ে নির্যাতন ও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শেষ পর্যন্ত ইতালি পৌঁছাতে না পেরে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। এখন হারানো অর্থের পাশাপাশি পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী হাউসের বাবা আসাদুল ওরফে আপানুর বলেন, তার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। ভুক্তভোগীরা সাগর দেখে ভয় পেয়ে নিজেরাই ফিরে এসেছেন। তাদের নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।
তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা স্বেচ্ছায় ফিরে আসেননি। বরং বন্দিদশা, নির্যাতন, অর্থ আদায় এবং সাগরপথে বিপজ্জনক যাত্রার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে। এ ঘটনায় টাকা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ