নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের চোখের জলে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। উৎসবের শেষ দিনে দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ, সিঁদুর খেলা আর বিজয়া শোভাযাত্রায় মেতে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। আনন্দের রঙে রাঙানো মন্দির প্রাঙ্গণে তখন বিষাদের ছায়াও। একদিকে দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনা, অন্যদিকে আগামী বছর আবারও তার আগমনের প্রত্যাশা। গতকাল বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে চুয়াডাঙ্গা শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাথাভাঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। এর আগে বিকেল চারটার দিকে শহরের বিভিন্ন মন্দির থেকে প্রতিমা নিয়ে শুরু হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। ঢাকের বাদ্য ও গানবাজনার তালে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি। পরে মাথাভাঙ্গা নদীতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।
বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নদীর তীর ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও এসআরবি সদস্যদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন। আয়োজকদের ভাষ্য, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। সকালে জেলার বিভিন্ন মন্দিরে শুরু হয় বিজয়া দশমীর শেষ পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, পূজার ঘণ্টাধ্বনি, ঢাকের তাল, ধূপের সুবাস আর ফুলের অঞ্জলিতে দেবীর চরণে শেষবারের মতো প্রণাম জানান ভক্তরা। চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গামন্দিরেও সকাল থেকে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপ, ফুল ও বেলপাতা দিয়ে দেবীর চরণে শেষ অর্ঘ্য নিবেদন করেন তাঁরা। প্রার্থনায় ছিল পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সবার সুস্বাস্থ্য এবং দেশ ও মানুষের শান্তি-সমৃদ্ধির কামনা।
শেষ পূজার পর দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা। এরপর শুরু হয় দেবীকে বরণ ও সিঁদুর খেলা। ভক্তরা দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। পরে একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, হাসি আর চোখের কোণে জমে থাকা জলÑসব মিলিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ভক্ত সুমিতা দে বলেন, দশমীর পূজা শেষে সবাই অঞ্জলি দিয়েছেন। এরপর দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। মন্দিরে দেবীকে বরণ ও সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হয়। পরে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় মাথাভাঙ্গা নদীতে বিসর্জনের জন্য। আরেক ভক্ত অর্পিতা বিশ্বাস বলেন, মন্দিরে আসা ভক্তদের প্রার্থনায় ছিল দেশ ও মানুষের মঙ্গল কামনা। মায়ের কাছে তাদের একটাই প্রার্থনাÑদেশটা যেন ভালোভাবে চলে, মানুষ যেন শান্তিতে থাকে। ভক্ত অর্পণ চক্রবর্তী বলেন, মা চলে গেছেন, তাই মনটা একটু খারাপ। তবু আমরা এটাকে উদ্যাপন করছি। আসছে বছর আবার হবেÑএই প্রত্যাশা। সবাই যেন সুস্থ থাকে, দেশের ভালো কিছু হয় এবং পরিবারের সবাই ভালো থাকে, সেই প্রার্থনা করি।
জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির আয়োজকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় মোট ১১৬টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৩৩টি, আলমডাঙ্গায় ৩৯টি, দামুড়হুদায় ২০টি এবং জীবননগরে ২৪টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়। এবার তিথিগত বিশেষত্বের কারণে মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছয় দিন ধরে চলে। সপ্তমী তিথি দুই দিন হওয়ায় এই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে ঘোটকে এবং গমন হয়েছে নৌকায়। প্রচলিত বিশ্বাসে ঘোটকে আগমনকে ‘ছত্রভঙ্গ’ এবং নৌকায় গমনকে শস্য ও জলবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
চুয়াডাঙ্গা জেলা শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উদ্যাপনের প্রধান সমন্বয়ক হেমন্তু কুমার সিংহ রায় বলেন, বুধবার বিকেল চারটায় জেলার বিভিন্ন মন্দির থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হয়। শান্তিপূর্ণভাবে শোভাযাত্রা শেষ হয়েছে। বিজয়া দশমীতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সুশৃঙ্খলভাবে মাথাভাঙ্গা নদীতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছে।
দেবীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো অপেক্ষা, আনন্দ, প্রার্থনা ও মিলনমেলায় ভরা আরেকটি শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রতিমা বিসর্জনের পরও ভক্তদের মনে রয়ে গেল উৎসবের স্মৃতি আর আগামী শরতে আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। বিদায়ের বেলায় তাই সবার কণ্ঠে একটাই আকুতিÑআসছে বছর আবার হবে।
আলমডাঙ্গা অফিস জানিয়েছে, প্রতিমা বিসর্জন, সিঁদুর খেলা ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল বুধবার বিজয়া দশমীতে উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা-অর্চনা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে। আলমডাঙ্গা উপজেলায় এ বছর ৩৯টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজাকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষের পদচারণে মুখর ছিল পূজামণ্ডপগুলো।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল আনন্দঘন পরিবেশ। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি অনেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে অংশ নেন। বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা, পূজা-অর্চনা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। উৎসবকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের মধ্যে ভক্তি, আনন্দ ও সম্প্রীতির পরিবেশ দেখা যায়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
জীবননগর অফিস জানিয়েছে, শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, গান-বাজনা এবং সিঁদুর খেলার অনাবিল আনন্দে মেতে উঠে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যধাম থেকে বিদায় জানান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গতকাল বুধবার বিজয়া দশমীতে বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে নারী ও তরুণীরা মেতে ওঠেন ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায়। এ সময় ডিজে ও গান-বাজনার তালে তালে শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ নেচে গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। পরে ভক্তরা অশ্রুসজল নয়নে ও শুভকামনা জানিয়ে প্রতিমাগুলো জলাশয়ে বিসর্জন দেন।
উৎসবের এই সমাপনী দিনে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিজিবি তৎপর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ভক্তদের প্রত্যাশা, আগামী বছর দেবী দুর্গা আবারও মর্ত্যে ফিরে আসবেন এবং সবার জীবনে শান্তি, সুখ ও মঙ্গল বয়ে আনবেন।
দামুড়হুদা অফিস জানিয়েছে, দামুড়হুদা উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল বুধবার বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে উপজেলার ২০টি পূজামণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়। আনন্দ, ভক্তি আর বিদায়ের আবেগঘন পরিবেশে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান পূজারিরা। পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। গতকাল বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি শুরু হয়। দিনভর চলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা, আরতি ও শোভাযাত্রা। পরে নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের শারদীয় উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে পূজামণ্ডপ ও বিসর্জনস্থলে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এবার দামুড়হুদা উপজেলায় মোট ২২টি স্থানে দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্যে ২০টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া পূজাকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেই আনন্দের পরিসমাপ্তি ঘটে। দামুড়হুদার চিৎলা শ্রীশ্রী সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সভাপতি মদন কুমার হালদার বলেন, গত ১৬ অক্টোবর থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপন করেছি। এ সময়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। দামুড়হুদা উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় হালদার বলেন, এবার আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে পেরেছি। এ জন্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মেসবাহ উদ্দিন বলেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সুশৃঙ্খল এবং উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন বলেন, জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা এবং নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তৎপরতায় উপজেলায় শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের সূচনা হয়। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস, ভক্তি ও আবেগের মেলবন্ধনে প্রতিমা বিসর্জন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দেবীর বিদায়কে ঘিরে আনন্দ-বেদনার এক বিশেষ মুহূর্ত। দামুড়হুদাতেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব।
কার্পাসডাঙ্গা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। আনন্দ-উৎসবে শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তিতে ভক্তদের মধ্যে দেখা যায় আবেগ, ভালোবাসা আর আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জগন্নাথপুরে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এ উপলক্ষে পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় ভক্তদের উপস্থিতিতে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। বিসর্জনের সময় ঢাকের শব্দ ও উলুধ্বনির সঙ্গে ধর্মীয় আচার পালন করে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। এ সময় অনেককে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়।
বিসর্জন উপলক্ষে ভক্তদের মধ্যে ছিল একদিকে উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর বিষাদ। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপে মণ্ডপে যে আনন্দ, মিলন ও উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছিল, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। ভক্ত শ্রী সুজন ও রানী সরকার বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনেরও প্রতীক। প্রতিবছর এ উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। তারা মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেন, পৃথিবী থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি অটুট থাকুক।
জগন্নাথপুর শ্রী শ্রী রায়কৃষ্ণ ঠাকুর মন্দিরের সভাপতি শ্রী দেবদত্ত বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে জগন্নাথপুরে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটেছে। আগামী বছর আবারও নতুন আনন্দ, আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় থাকবেন ভক্তরা।
বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও ভক্তদের মনে রয়ে গেছে উৎসবের স্মৃতি, সম্প্রীতির বার্তা আর আগামী শরতে দেবী দুর্গাকে আবার বরণ করে নেয়ার প্রত্যাশা।
মেহেরপুর অফিস জানিয়েছে, সিঁদুর খেলা, ঢাক-ঢোলের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে মেহেরপুরে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল বুধবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ভৈরব নদে একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। বিদায়ের ক্ষণে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি অনেক ভক্তের চোখে ছিল অশ্রু।
‘দুর্গা মা কি জয়, মহামায়া কি জয়’ এমন জয়ধ্বনি, ঢাক-ঢোল, কাঁসর ও ঘণ্টার বাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে ভৈরব নদের দুই পাড়। শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে প্রতিমা বিসর্জনস্থলে আসেন ভক্তরা। পরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হয়। শহরের শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, শ্রীশ্রী হরিভক্তি প্রদায়িনী পূজামন্দির, নায়েব বাড়ির রাধামাধব মন্দির, মালোপাড়া, হালদারপাড়া ও বামনপাড়াসহ বিভিন্ন মন্দিরের প্রতিমা ভৈরব নদে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী। কেউ ঢাকের তালে নেচে-গেয়ে বিদায় জানান দেবীকে, আবার কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মায়ের বিদায়বেলায়। এর আগে সকালে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, অঞ্জলি, সিঁদুর খেলা ও দর্পণ বিসর্জনের আয়োজন করা হয়। ধান, দুর্বা, মিষ্টি ও আবির দিয়ে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা কৈলাসে স্বামীর গৃহে ফিরে গেলেও আগামী শরতে আবারও ফিরে আসবেন ভক্তদের মাঝে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দেবীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা।
এদিকে, মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলাতেও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। উপজেলার আটটি পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। মহাজনপুর, কোমরপুর, মোনাখালী, দারিয়াপুর-খানপুর, রতনপুর ও বল্লভপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা বিসর্জনস্থলে সমবেত হন। বিকেল থেকে ঢাক-ঢোলের বাদ্য, উলুধ্বনি ও জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ ট্রাক ও ভ্যানে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনস্থলে যান। পথে পথে দর্শনার্থীরা শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানান। বিসর্জনস্থলে প্রতিমা পৌঁছানোর পর ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। বিসর্জনকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় আবেগঘন পরিবেশে। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন আয়োজকেরা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মেহেরপুরে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।


