ঢাকা অফিস:
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান করার পাশাপাশি উচ্চকক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টকে ঘিরেও বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে প্রায় ৬০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাদের ৪৪ জন উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আলোচনা চলে। আলোচনায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ আইন করার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানান সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।কমিটি সূত্র জানায়, বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো শিথিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেনি বিশেষ কমিটি। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিটির আরো এক-দুটি বৈঠক করবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। বিরোধী দলকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে মতামত সংকলন ও মূল্যায়নের কাজ দ্রুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, বিচারক নিয়োগ আইন প্রণয়ন, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর স্বাধীন কর্মপরিধি নির্ধারণ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৬ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের মনোনয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছিল, সে অনুযায়ী বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে না রেখে সবার সম্মতির ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হওয়ার ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, সে বিষয়টি বিবেচনায় এসেছে। সে ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। আবার সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের সম্মতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব এসেছে। তবে, এগুলো এখনো চূড়ান্ত প্রস্তাব নয়। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও এখতিয়ার নিয়ে লিখিত মতামত চাওয়া হয়েছে। সকলের মতামত পর্যালোচনা করে কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশে ভুলত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। তবে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বহাল রয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন বলে আলোচনায় মত এসেছে। এ পর্যন্ত এই চারটি ক্ষেত্রের বাইরে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার সীমিত করার কোনো প্রস্তাব আসেনি। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে বিরোধী দল থেকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। সরকারি হিসাব কমিটিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়টিও সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের পর এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
এদিকে বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন কাঠামোয় গঠিত হবে,তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা ও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও কথা হয়েছে। তিনি আশা করেন, বর্তমান সংবিধানের চেয়ে আরও উন্নত ও কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের পথে এগোনো সম্ভব হবে। বিচারক নিয়োগ আইন ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাদ পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, বিএনপিরও এসব উদ্যোগের পক্ষে অঙ্গীকার ছিল। বৈঠকে তিনি বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পরবর্তী সময়ে আইনগুলো করবে। অর্থাৎ বিষয়গুলো একেবারে বাদ দেয়া হয়নি বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো যাতে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের বিষয়টিও তুলেছেন আসিফ নজরুল। এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নেবে বলে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, সে সময় অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু পরে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা নিয়ে তিনি হতাশ হয়েছিলেন। এবারের সংশোধনপ্রক্রিয়ায় সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশাকরি। গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা যেন আলোচনায় গুরুত্ব পায়, সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সাকিলা ফারজানা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে সংবিধান সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর নীতি, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোটদানের সুযোগ রাখার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।


