নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘আমার বুকের মানিককে ওরা কেন মারল? ভাত খাওয়ার মূল্য যদি জীবন দিয়ে দিতে হয়, তাহলে পৃথিবীতে মানবতা থাকল কোথায়? ওরাও তো মানুষ। ওদের মনে কি কোনো দয়া-মায়া নেই? আমার ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছে তাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন খুলনা নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী দর্শনা বড়শলুয়া গ্রামের নিহত আজমুল হোসেনের মা আসমা খাতুন। তিনি বলেন, চোখের সামনে যেন বারবার ভেসে উঠছে সন্তানের মুখ। বুক চাপড়ে আর্তনাদ করে তিনি বলছিলেন, তার সোনা ছেলেটি কী এমন অপরাধ করেছিল যে তাকে মেরে ফেলতে হলো? ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে সন্তানের প্রাণ কেড়ে নেয়ার অভিযোগে প্রশ্ন তোলেন তিনিÑমানুষের প্রতি মানুষের এতটুকু মায়াও কি অবশিষ্ট নেই? নিজ সন্তানকে হত্যার প্রতিবাদ এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও আমজনতার ব্যানারে আজমুল হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন অংশগ্রহণকারীরা। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে মিশে ছিল বিচার পাওয়ার আকুতি। আসমা খাতুন বলেন, তার আজমুল আর কোনো দিন মায়ের কাছে ফিরে আসবে না। ঘরের দরজা খুলে আর কোনো দিন ডাকবে না ‘মা’। কিন্তু যে মানুষগুলো তার ছেলেকে হত্যা করেছে বলে পরিবারের অভিযোগ, তাদের যেন আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। এটাই এখন তার একমাত্র দাবি।
আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড়শলুয়া গ্রামের কুতুব আলীর ছেলে। তিনি খুলনা নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কর্মসূচিতে জানানো হয়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনায় আজমুলের মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে। তবে আজমুলের মৃত্যুকে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে চুয়াডাঙ্গায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার ইনিশিয়েটিভের সভাপতি আহসান হাবিবের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন আজমুলের বাবা কুতুব আলী। তিনি অভিযোগ করেন, আমার ছেলেকে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার ছেলে কোনো ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। মেস ম্যানেজার মেহেদী ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা তাকে হত্যা করেছে। কুতুব আলী বলেন, ঘটনার আগে এক রাতে মেসের বড় ভাই মেহেদী নামের এক ব্যক্তি আজমুলের কাছে ফোন করেন। তিনি আজমুলের কাছে ৫৮ হাজার টাকা চান। আজমুল জানায়, তার কাছে এত টাকা নেই। পরে ২৩ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে মেহেদীর কাছে পাঠায় বলে দাবি করেন কুতুব আলী। এরপর মেহেদী তাকে ফোন করে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা হয়েছে এবং দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে। কুতুব আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে রাতে আজমুল তাকে ফোন করে জানায়, খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। এ সময় বাবাকে তাদের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করে আজমুল। কুতুব আলী বলেন, আজমুল আমাকে বলেছিল, বাবা, আপনি একটু তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন মেহেদী নামের একজন আমার সঙ্গে কথা বলেন। তারা বলেন, আঙ্কেল, একটু ঝামেলা হয়েছে। আপনি এক লাখ টাকা বা তার চেয়ে কিছু বেশি টাকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। ছেলের কোনো ক্ষতি না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রয়োজনীয় টাকা দেয়ার আশ্বাস দেন বলে জানান কুতুব আলী। তার ভাষ্য, তিনি তখন বলেন, আমার ছেলের যেন কোনো কিছু না হয়। যত টাকা লাগে আমি দেব। কুতুব আলী বলেন, তখন রাত প্রায় ১২টা। তিনি পরদিন সকালে খুলনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা জানান। কিন্তু মেহেদী তাকে যত দ্রুত সম্ভব আসতে বলেন। কুতুব আলীর দাবি, মেহেদী তাকে বলেন, আপনি কখন আসবেন, ট্রেনে আসবেন, প্লেনে আসবেন, বাসে আসবেনÑসেটা আমার দেখার দরকার নেই। যত তাড়াতাড়ি পারেন আসেন। ছেলের বিপদের আশঙ্কায় আর অপেক্ষা করেননি কুতুব আলী। ওই রাতেই ট্রেনে করে খুলনার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যে খবর পান, তা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম সংবাদ। কুতুব আলী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার দেখা হয়। ওই ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আজমুলের বাবা কী-না। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে আর বেঁচে নেই। ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পরে আজমুলকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান তার বাবা।
ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, বরং হত্যাকাণ্ডÑএমন অভিযোগ তুলে কুতুব আলী বলেন, আমার ছেলে যদি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে থাকে, তাহলে তাকে যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে কি কোনো সিসিটিভি ছিল না? কোনো সিসিটিভিতে তো দেখা যাচ্ছে না যে আমার ছেলে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মারা গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। চার দিন পেরিয়ে গেলেও ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নিÑএমন অভিযোগ তুলে কুতুব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি তার ছেলের মৃত্যুর বিচার দাবি করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এ ঘটনার বিচার চান বলে কর্মসূচিতে উল্লেখ করেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আজমুলের মা আসমা খাতুনের কণ্ঠ বারবার কান্নায় ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘আমার বুকের মানিককে ওরা কেন মারল? আমার সোনা আজমুলের কী দোষ ছিল? ভাত খেয়েছেÑএটাই কি এত বড় অপরাধ যে তার জন্য জীবন দিতে হবে?’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে তো আর কোনো দিন আমার কাছে ফিরে আসবে না। আমি আর তাকে আদর করতে পারব না, তার মুখে খাবার তুলে দিতে পারব না। আমার ঘরটা খালি হয়ে গেছে। কিন্তু যারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে, তাদের বিচার চাই। আমি চাই, তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়। আসমা খাতুন আরও বলেন, ‘ওরাও তো মানুষ। ওদের কি মায়া হয়নি? আমার ছেলেটার জন্য কি একটুও দয়া হয়নি? আমার আজমুলকে আমি ফিরে পাব নাÑএ সত্য আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার সন্তানের মৃত্যুর বিচার না হলে একজন মা হিসেবে আমি কোথায় যাব?’
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোমিন মালিতা, জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি জুয়েল মাহমুদ এবং চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর থানা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মতিউর রহমান মিশর, দর্শনা থানা কৃষকদলের সদস্য সচিব আবু তিলুয়ার রহমান মুন্না, নিহত আজমুলের স্বজনেরা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ।
বক্তারা বলেন, আজমুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, না-কী তাকে হত্যা করা হয়েছেÑসুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগের গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
কর্মসূচি থেকে আজমুল হোসেনের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিলটি যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে থামে, তখনও স্বজনদের চোখেমুখে ছিল শোক আর ক্ষোভ। আর আজমুলের মা আসমা খাতুনের কণ্ঠে তখনও একটাই আকুতিÑছেলেকে তিনি আর ফিরে পাবেন না, অন্তত তার মৃত্যুর সঠিক বিচার যেন পান।


