মেহেরপুর থেকে নাছিম হাসান:
পরাজয় যে থেমে যাওয়ার নাম নয়, সেটিই যেন নিজের জীবনে প্রমাণ করেছেন মেহেরপুরের তরুণ উদ্যোক্তা বাঁধন। একের পর এক ব্যর্থতা, লোকসান আর প্রতিকূলতার পরও হাল ছাড়েননি তিনি। মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন হাঁস পালন। তিন বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে প্রায় এক হাজার হাঁসের খামারে। শুধু হাঁস পালনেই থেমে থাকেননি, খামারের পাশে গড়ে তুলেছেন ৩৬ হাজার বাচ্চা ধারণক্ষমতার ইনকিউবেটর। সেখান থেকে সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছেন তিনি। সব পরিচালন ও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা মুনাফা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাঁধন। ইতিমধ্যে আরও ৫ হাজার হাঁস নিয়ে খামার সম্প্রসারণের প্রস্তুতিও শুরু করেছেন তিনি। বাঁধন মেহেরপুর সদর উপজেলার রাধাকান্তপুর গ্রামের সেলিম ও দিলরুবা খাতুন দম্পতির ছেলে। তিনি মেহেরপুর সরকারি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির প্রতি আলাদা আকর্ষণ ছিল বাঁধনের। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নও দেখতেন তখন থেকেই। সেই আগ্রহ থেকেই প্রথমে বাড়ির ছাদে শখের বশে বাজরিকা পাখি পালন শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেটিকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এর মধ্যেই আঘাত হানে কোভিড-১৯ মহামারি। ব্যবসাটি আর দাঁড় করাতে পারেননি তিনি। হাল না ছেড়ে এরপর ব্রয়লার মুরগি পালনে নামেন বাঁধন। শুরুতে ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে তার বিনিয়োগের বড় অংশই হারিয়ে যায়। পরপর দুটি উদ্যোগে ব্যর্থতার পর থেমে যেতে পারতেন বাঁধন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং নতুন করে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকেন। সেই সময় ইউটিউবে বিভিন্ন উদ্যোক্তার হাঁস পালন করে সফল হওয়ার গল্প তার নজরে আসে। সেখান থেকেই হাঁস পালনের চিন্তা মাথায় আসে।
প্রায় তিন বছর আগে মায়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে অনলাইনে খোঁজখবর শুরু করেন বাঁধন। বিভিন্ন জাত ও হাঁস পালনের পদ্ধতি সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করে ‘পিকিং স্টার-১৩’ জাতের ১০০টি হাঁসের বাচ্চা কিনে শুরু করেন খামার। ছোট পরিসরে শুরু করা সেই খামারই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত খাবার, রোগবালাই সম্পর্কে সতর্কতা এবং কঠোর পরিশ্রমে হাঁসের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাঁর খামারে প্রায় এক হাজার হাঁস রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হাঁসই ডিম দিতে শুরু করেছে। তবে বাঁধনের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প এখানেই শেষ নয়। হাঁসের ডিম থেকে শুধু ডিম বিক্রি না করে কীভাবে আরও মূল্য সংযোজন করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই ইনকিউবেটর স্থাপনের উদ্যোগ নেন তিনি। খামারের পাশেই স্থাপন করেন ৩৬ হাজার বাচ্চা ধারণক্ষমতার ইনকিউবেটর মেশিন। এখন হাঁসের ডিম কৃত্রিম উপায়ে ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করছেন। এসব বাচ্চা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ইনকিউবেটর থেকে সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। এসব বাচ্চার সাপ্তাহিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে তাঁর মাসিক মুনাফা প্রায় ৪ লাখ টাকা। শুরুতে যেখানে ১০০টি হাঁস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, এখন সেখানে প্রায় এক হাজার হাঁস। এবার লক্ষ্য আরও বড়। আরও ৫ হাজার হাঁসের খামার তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বাঁধন বলেন, ছোট থেকেই পশু-পাখির ওপর আমার আলাদা একটা মায়া ছিল। সেই থেকেই বাড়ির ছাদে বাজরিকা পাখি দিয়ে শুরু করেছিলাম। ব্যবসা কী, সেটি বোঝার চেষ্টা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত করোনা মহামারির মধ্যে ব্যবসাটা দাঁড় করাতে পারিনি। পরে মুরগি নিয়ে কাজ শুরু করি। মুরগির ব্যবসা ভালোই চলছিল। হঠাৎ বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক টাকা লোকসান হয়ে যায়। তিনি বলেন, পরে ইউটিউবে দেখি, কিছু উদ্যোক্তা হাঁস পালন করে সফলতা পাচ্ছেন। সেখান থেকেই হাঁস পালনের চিন্তা মাথায় আসে। পরে অনেক যাচাই-বাছাই করে অনলাইন থেকে পিকিং স্টার-১৩ জাতের ১০০টি হাঁস কিনে খামারের যাত্রা শুরু করি। এখন আমার খামারে প্রায় এক হাজার হাঁস রয়েছে। অধিকাংশ হাঁস ডিম দিতে শুরু করেছে। এখন নিজেরাই ইনকিউবেটর মেশিনের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটিয়ে বাজারজাত করছি। বাঁধনের ভাষ্য, সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা মুনাফা হচ্ছে। সামনে আরও ৫ হাজার হাঁসের খামার তৈরির প্রস্তুতি চলছে।
ছেলের উদ্যোগের শুরু থেকে পাশে ছিলেন মা দিলরুবা খাতুন। তার দেয়া ২০ হাজার টাকা দিয়েই বাঁধনের হাঁসের খামারের শুরু। এখন সেই উদ্যোগের মূলধন ও সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে বলে দাবি তাঁর। দিলরুবা খাতুন বলেন, ছোট থেকেই পশু-পাখির প্রতি আগ্রহ ছিল ছেলের। ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে সে। প্রথমে বাজরিকা পাখি পালন শুরু করলেও করোনার ধাক্কায় সফল হতে পারেনি। পরে আবার মুরগি পালন শুরু করলেও সেখানেও সফল হতে পারেনি। পরপর দুটি ব্যর্থতার পরও সে থেমে যায়নি। হাঁস পালনে ছেলের হাতে মাত্র ২০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলাম। সেই ২০ হাজার টাকা থেকে বর্তমানে ৩০ লাখ টাকায় ঠেকেছে। তিনি আরও বলেন, চাকরির পেছনে না ছুটে বাবা-মায়েরা যেন তাদের সন্তানদের উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলেন।
মেহেরপুরে হাঁসসহ বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখি পালনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা। খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মেহেরপুর প্রাণিসম্পদে একটি সমৃদ্ধ জেলা। এই জেলায় বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখি লালন-পালন করা হয়। আমরা প্রাণিসম্পদের পক্ষ থেকে খামারিদের পশু-পাখি লালন-পালন, ভ্যাকসিন সরবরাহ ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, এখানে হাঁস পালনে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। এখানকার খামারিরা অনেক কর্মঠ। তাদের সব ধরনের সহযোগিতা ও সমস্যা সমাধানে জেলা প্রাণিসম্পদ সবসময় তাদের পাশে রয়েছে।
দুইবারের ব্যর্থতার পর তৃতীয়বারের চেষ্টায় বাঁধনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তাই শুধু একটি খামারের সাফল্যের গল্প নয় এটি ছোট পুঁজি, ধৈর্য ও নতুন কিছু করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে চলা এক তরুণের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগকে ধাপে ধাপে বড় করে তোলার এই পথচলায় এখন তার সামনে আরও বড় খামার ও আরও বড় স্বপ্ন।


