চুয়াডাঙ্গায় ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যেই শিশুদের মধ্যে আবারও হামের উপসর্গ বাড়তে থাকা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, একদিকে সংক্রামক রোগের বিস্তার, অন্যদিকে সেই রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য হাসপাতালের সীমিত অবকাঠামো ও জনবল। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বর্তমান চিত্র এ সংকটেরই নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরছে। মাত্র ২২ শয্যার ওয়ার্ডে যদি ১৩০ শিশু ভর্তি থাকে, তাহলে সেখানে চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা যেমন কঠিন, তেমনি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাম এমন একটি রোগ, যা টিকাদানের মাধ্যমে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সে কারণে চলতি বছর চুয়াডাঙ্গায় ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। জেলার ৬ মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৩০৫ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৯৮০টি কেন্দ্রে বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এত বড় কর্মসূচির পরও যদি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে প্রতিদিন চার-পাঁচটি শিশু ভর্তি হয় এবং চলতি বছরে এ সংখ্যা ৭১২-তে পৌঁছায়, তাহলে বিষয়টি শুধু রোগীর সংখ্যা দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। টিকাদান কর্মসূচির আওতা, টিকার কার্যকারিতা, টিকা না পাওয়া শিশুদের অবস্থা এবং কর্মসূচির পরবর্তী নজরদারিÑসবকিছুই নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে টিকা নেয়ার পর কোনো শিশুর হামজাতীয় উপসর্গ দেখা দিলেই টিকা কার্যকর হয়নিÑএমন সরল সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক হবে না। রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে টিকার সময়, ডোজ, বয়স, শিশুর পূর্ববর্তী রোগ এবং অন্যান্য সংক্রমণের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত, এ বিষয়ে অভিভাবকদের বিভ্রান্ত না করে স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দেয়া। সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন হাসপাতালের সক্ষমতা। ২২ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ১৩০ শিশুÑএই হিসাবই বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা নাজুক। শয্যার অভাবে মেঝে ও বারান্দায় শিশুদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, এমনকি একটি শয্যায় একাধিক রোগী থাকার অভিযোগও রয়েছে। সংক্রমণজনিত রোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভিড় শুধু অস্বস্তিকর নয়, এটি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে হাম, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগী থাকলে ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট। মাত্র দুজন নার্স দিয়ে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগী সামলানো যে অত্যন্ত কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেও প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন না। তাই জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবল সংযুক্ত করা দরকার। প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সাময়িকভাবে জনবল পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার অভিযোগটিও কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়। শিশু ওয়ার্ডের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা এবং মশার উপদ্রব থাকা একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর চাপ মোকাবিলা করা একটি হাসপাতালের জন্য গুরুতর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ওয়ার্ড ও আশপাশের এলাকা জীবাণুমুক্ত রাখা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ পৃথক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ সংকটকে শুধু সদর হাসপাতালের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র নিয়ে কাজ করতে হবে। কোন উপজেলায় হামের উপসর্গ বেশি, কোন বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, টিকাদানের আওতা কতটা ছিল, আক্রান্তদের মধ্যে কতজন টিকা নিয়েছিল এবং রোগীদের মধ্যে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা কতটা রয়েছেÑএসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়ে সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। নিজেরা ওষুধ না খাইয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া এবং সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখাও জরুরি। একই সঙ্গে টিকাদানের বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য নিতে হবে। চুয়াডাঙ্গায় হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বৈত চাপ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ। শিশুর জন্য একটি শয্যা, একজন প্রশিক্ষিত নার্স, একটি পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড কিংবা সময়মতো একটি টিকাÑএসব কোনো বিলাসিতা নয়, এগুলো মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ। তাই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল নিশ্চিতকরণ এবং হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাÑসবগুলো বিষয়কে একই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শিশুদের চিকিৎসা পাওয়ার জন্য যেন মেঝে বা বারান্দায় জায়গা খুঁজতে না হয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।


