নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় মা ইলিশ সংরক্ষণে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিক্রি বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রচারণা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয়টি পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের যথাসময়ে জানানো হয়নি। ফলে নিষেধাজ্ঞার আগে সংগ্রহ করে কোল্ড স্টোরেজে রাখা ইলিশ বিক্রি করতে না পারলে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। গতকাল বুধবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গা মৎস্য ব্যবসায়ী মালিক সমিতির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় সমিতির সভাপতি শহিদুল ইসলাম ফিরোজ এসব কথা বলেন।
শহিদুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের অন্তত এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন আগে মৎস্য ব্যবসায়ীদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এতে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই ইলিশের মজুত কমিয়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পান। তার অভিযোগ, এবার আগাম কোনো চিঠি দেয়া হয়নি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো সভাও করা হয়নি। হঠাৎ করে ৭ অক্টোবর রাত ১২টার পর থেকে ইলিশ বিক্রি বন্ধের কথা জানানো হয়েছে। ফলে অনেক আড়তদার নিষেধাজ্ঞা ৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে ধরে নিয়ে আগে থেকেই ইলিশ সংগ্রহ করে কোল্ড স্টোরেজে রেখেছেন।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর এসব মাছ বিক্রি করতে না পারলে পচনশীল পণ্যের কারণে তাদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। এ অবস্থায় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে প্রস্তুত থাকলেও আগে থেকে মজুত থাকা ইলিশ বিক্রির জন্য অন্তত এক দিন সময় দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। শহিদুল ইসলাম আরও ফিরোজ বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা আইন মেনে চলতে চাই। কিন্তু আগে থেকে জানানো না হলে আড়তদারদের হাতে থাকা মাছের কী হবে? অন্তত এক দিন সময় দিলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতেন।
তবে ব্যবসায়ীদের এই অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন চুয়াডাঙ্গার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরহাদ রেজা। তিনি বলেন, আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে সব ধরনের ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিক্রি বন্ধ থাকবে। এ নিষেধাজ্ঞা শুধু জাটকা বা ছোট ইলিশের ক্ষেত্রে নয়, সব আকারের ইলিশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে ৭ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার সব উপজেলায় একযোগে মাইকিং, ব্যানার টাঙানো এবং ব্যবসায়ীদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। উপজেলা মৎস্য দপ্তরের উদ্যোগে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি বলেন, অন্য আরেকটি কাজে থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আগের দিন উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে ৭ অক্টোবর সকালে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। বড়বাজারের ইলিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও তিনি নিজে কথা বলেছেন। তারা ৭ অক্টোবর রাত ১২টার মধ্যে ইলিশের সব ধরনের ক্রয়-বিক্রয় শেষ করার বিষয়টি জানেন বলে তাকে জানিয়েছেন। একইভাবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কথা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের আগে থেকে জানানো হয়নিÑএমন অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ফরহাদ রেজা বলেন, ইলিশ আহরণ ও বিপণনের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রতিবছর অক্টোবর মাসে কার্যকর হয়। এটি প্রতিবছরের একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই ব্যবসায়ীদের বিষয়টি আগে থেকেই জানা থাকার কথা।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের কোনো দ্বিমত নেই। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। তাদের আপত্তি মূলত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়াকে ঘিরে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ইলিশ এমন একটি পচনশীল মাছ, যা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। তাই নিষেধাজ্ঞার আগে আড়তে থাকা মাছ বিক্রি বা নিরাপদে ব্যবস্থাপনার সুযোগ না পেলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিক্রিÑসব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এই সময়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তরকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর কোনোভাবেই ইলিশ বিক্রি করতে চান না। তবে নিষেধাজ্ঞার আগে আড়ত ও কোল্ড স্টোরেজে থাকা মাছের বিষয়ে মানবিক ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেয়া হলে একদিকে যেমন সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।


