নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৪৫ জন সার ডিলারের মধ্যে ৪২ জনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ তুলেছেন জেলার দুটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াত নেতৃবৃন্দ। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় জামায়াতের জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমিন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সার ডিলার নিয়োগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আট দফা দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৬ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলায় ৪৫টি বিসিআইসি সার ডিলারশিপের বিপরীতে মোট ৬৪২টি আবেদন জমা পড়ে। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ৪৫ জনের মধ্যে ৪২ জনই বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী ও স্বজনেরাও রয়েছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরও ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ তোলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, কয়েকটি স্থানে সার ডিলারশিপ পাইয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের ঘটনাও ঘটেছে। যোগ্য আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত প্রভাবের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে কী-না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান জামায়াতের নেতারা।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, এবার সার ডিলার নিয়োগে বিগত সময়ের অনিয়মের সব রেকর্ড ভেঙেছে। তার অভিযোগ, আগে যারা সার ডিলার ছিলেন, তাদের অনেকেই তৎকালীন সরকারের বড় কোনো পদধারী ছিলেন না। অথচ এবার দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করতেই তড়িঘড়ি করে নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়েছে। মাসুদ পারভেজ রাসেল আরও বলেন, নীতিমালার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের বাইরে রেখে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো নিয়োগ দেয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ বা সরকারিকরণের নামে অনিয়মের পথ তৈরি করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, এবার যারা সার ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের কেউই ব্যবসায়ী নন। তার অভিযোগ, নথিপত্র যাচাই করলে দেখা যেতে পারে, নির্বাচিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন এবং ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্ত্রী ও ছেলেরাও ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। রুহুল আমিন বলেন, গোটা জেলাতেই এভাবে সার ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তিনি আরও বলেন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে পুরোনো বোতলে নতুন মদ। এই সার ডিলার নিয়োগ জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন হয়নি। এটা জনগণের নির্বাচিত সরকার, ফ্যাস্টিস্টদের তাড়িয়ে দেয়ার পর এটা একটা সরকার। এই সরকারের কাছে পুরাতন বিষয়টি আসা মোটেও কাম্য নয়। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই এই ডিলার নিয়োগে প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তা ডিসি, তিনি যেমন এ ব্যাপারে দায়ী তেমনই সরকারি দলের নেতারাও এ ব্যাপারে দায়ী। সবচেয়ে বেশী দায়ী করবো বর্তমান যিনি জেলা প্রশাসক তাকে। বর্তমান জেলা প্রশাসক দলীয় পোস্ট নিয়ে, দলীয় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি এ কাজটি করেছেন। আমরা এ কারণে কথাটি বলছি আগের সরকারের দলীয় লোকজন যেভাবে প্রশাসনকে বলতেন সেভাবেই কর্মকাণ্ড চলতো। এরকম ঘটনা যদি বর্তমান জেলা প্রশাসক করেন তার পরিণতি ভালো হবে না।
সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংবাদ সম্মেলনে আট দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াত। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১. সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ার অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন। ২. নির্বাচিত প্রত্যেক প্রার্থীর যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই। ৩. নিয়োগের নির্ধারিত মানদণ্ড, মূল্যায়নপদ্ধতি ও ফলাফল প্রকাশ। ৪. আবেদনকারীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা। ৫. আবেদনকারীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। ৬. ডিলারশিপ দেয়ার নামে অর্থ লেনদেন বা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তদন্ত করা। ৭. অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। ৮. তদন্ত চলাকালে প্রয়োজন হলে আইনগত ক্ষমতার আওতায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ।
লিখিত বক্তব্যে জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। জামায়াত নেতারা বলেন, সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, বরং প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও কৃষকসেবার মানসিকতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কৃষকেরা যাতে নির্ধারিত মূল্যে সময়মতো সার পান, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ, সার বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও কৃষিকাজের ওপর।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আজিজুর রহমান, জেলা প্রশিক্ষণ সম্পাদক জিয়াউল হক, জীবননগর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা পৌর জামায়াতের আমির হাসিবুল ইসলাম ও সেক্রেটারি মোস্তফা কামালসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।


