নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। চারপাশে হালকা কুয়াশার চাদর, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে চিকচিক করছে প্রকৃতি। দূর আকাশে সূর্যের আভা ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের মাঠে মাঠে শুরু হয় অন্য রকম ব্যস্ততা। কাঁধে দা নিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছুটছেন গাছিরা। কারও হাতে ধারালো দা, কেউ ব্যস্ত খেজুরগাছের শুকনো অংশ পরিষ্কার করতে, কেউবা গাছের গায়ে দাগ কেটে নিচ্ছেন রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা মানেই চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস আর গুড়ের মৌসুম শুরুর তোড়জোড়।
শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলার মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজ। গাছ কাটা, পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। তাদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও খেজুরের রস ও গুড় ঘিরে জমে উঠবে গ্রামীণ অর্থনীতি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখানকার গুড় ও পাটালি ছড়িয়ে পড়বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুরগাছ রয়েছে। এর মধ্যে দামুড়হুদা, দর্শনা ও আলমডাঙ্গা এলাকায় গাছের সংখ্যা বেশি। চলতি শীত মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন খেজুরের গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমেও একই লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সে বছর খেজুরের রস ও গুড়কেন্দ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। এবারও এ খাত ঘিরে বড় অঙ্কের বাণিজ্যের আশা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খেজুরগাছ পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকছেন গাছিরা। এ মৌসুমে একজন গাছি প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি গাছ কাটছেন। কাজের বিনিময়ে তাদের দৈনিক আয় হচ্ছে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। মৌসুমি এই কাজ থেকে পাওয়া আয় অনেক গাছির সংসার চালানোর গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। গাছিরা জানান, খেজুরের রস পেতে হলে সঠিক সময়ে গাছ প্রস্তুত করা জরুরি। গাছের ছাল ও শুকনো অংশ নিয়ম মেনে পরিষ্কার করতে হয়। পরিচর্যায় ত্রুটি থাকলে রসের প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। তাই শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই গাছ প্রস্তুতের কাজ এগিয়ে রাখছেন তারা। নভেম্বরের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে গাছে গাছে মাটির হাঁড়ি ঝোলানো হবে। এরপর রাতভর হাঁড়িতে জমবে খেজুরের রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে তরল গুড়, দানা গুড় ও পাটালি।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেলগাছি গ্রামের কৃষক শামিম হোসেন বলেন, শীতের আমেজ শুরু হতেই শ্রমিকসংকট এড়াতে আমরা আগেভাগেই গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছি। শীত আরেকটু বাড়লেই গাছে হাঁড়ি বাঁধা শুরু হবে। কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে গাছে গাছে হাঁড়ি পাতার কাজ শুরু করা হয়। রস থেকে তৈরি গুড় স্থানীয় হাটে বিক্রির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও পাঠানো হবে।
খেজুরের গুড় তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। গাছিরা বিশেষ কৌশলে গাছের অংশ ছেঁটে রস সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। সন্ধ্যায় গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হয় মাটির হাঁড়ি। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা করে তাতে জমে রস। ভোরে সেই রস সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বাল দেয়ার চুলায়। এরপর দীর্ঘ সময় জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় নানা ধরনের গুড় ও পাটালি।
কৃষক আবু বক্কর বলেন, এই মৌসুমে খেজুরের রস থেকে মানসম্মত ও সুস্বাদু গুড় তৈরি করি। গাছিরা অভিজ্ঞ হাতে গাছ ছেঁটে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে দেন। সারা রাত রস জমার পর সকালে তা চুলায় নিয়ে পরিচ্ছন্নভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেয়া হয়। এরপর তৈরি হয় ঝোল গুড়, দানা গুড় ও পাটালি।
কৃষক হাসেম আলী বলেন, শীতের মৌসুমে খেজুরের গুড়ের চাহিদা বেড়ে যায়। চুয়াডাঙ্গায় উৎপাদিত গুড় জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। গুড়ের গুণগত মান বজায় রাখতে রসের বিশুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। খেজুরের রস ও গুড় কেবল শীতের রসনাবিলাস নয়, চুয়াডাঙ্গার বহু মানুষের জীবিকারও উৎস। গাছ প্রস্তুত, রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি, পরিবহন ও বিপণনÑমৌসুমজুড়ে এসব কাজে যুক্ত হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফলে শীতের এই কয়েক মাসে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি গতি আসে। গাছিদের মৌসুমি আয় যেমন সংসার চালাতে সহায়তা করে, তেমনি কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও গুড় বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার আশা করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূরুল ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গার খেজুরের গুড়ের সুনাম ও ঐতিহ্য দেশজুড়ে রয়েছে। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ গুড়ের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলার উৎপাদিত গুড় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, শীতের শুরুতেই গাছিরা খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং পর্যাপ্ত শীত পড়লে এবারও নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কুয়াশাভেজা ভোরে মাঠে মাঠে গাছিদের এই কর্মব্যস্ততা জানান দিচ্ছে, চুয়াডাঙ্গায় শীতের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী মৌসুম দরজায় কড়া নাড়ছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। রাতভর জমবে রস, ভোরে জ্বলবে চুলা, আর সেই চুলার আগুনেই তৈরি হবে শীতের সুস্বাদু গুড়-পাটালি। প্রকৃতির শীতলতা যত বাড়বে, ততই প্রাণ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা চুয়াডাঙ্গার খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যে।


