জীবননগর অফিস:
মরুভূমি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ফল হিসেবে পরিচিত সাম্মাম। কোথাও এটি রকমেলন, কোথাও সুইট মেলন, মাস্ক মেলন কিংবা হানি ডিউ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের বাজারে এখনো খুব বেশি পরিচিতি না পাওয়া এই বিদেশি ফলই চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের দুই তরুণের হাত ধরে নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছে। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে সাম্মাম চাষ শুরু করেছিলেন জসিম হোসেন ও রাজিব হাসান। প্রথম চাষেই মিলেছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাফল্য। ফলন ও লাভ দেখে এখন এই বিদেশি ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন আশপাশের কৃষকেরাও।
জসিম ও রাজিব জানান, নতুন কিছু করার তাগিদ থেকেই চলতি বছরের জুনে স্থানীয় বীজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাম্মামের বীজ সংগ্রহ করেন তারা। এরপর জীবননগরে নিজেদের দেড় বিঘা জমিতে বাঁশের বাতা ও জাল দিয়ে মাচা তৈরি করে শুরু করেন চাষ। কুমড়ার মতো লতানো গাছের ফাঁকে ফাঁকে মাচায় ঝুলে থাকা গোলগাল ফলগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন বিদেশের কোনো ফলের বাগান। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, সাম্মাম চাষে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। বীজ রোপণের প্রায় ৩০ দিনের মধ্যেই গাছে ফুল আসে। কৃত্রিম পরাগায়নের ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফল ধরতে শুরু করে। এরপর সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই পাকতে শুরু করে ফল। অর্থাৎ বীজ বপনের প্রায় তিন মাসের মধ্যেই গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রথমবারের চাষেই আর্থিক সাফল্য পেয়েছেন দুই তরুণ। তাদের হিসাবে, দেড় বিঘা জমিতে সাম্মাম চাষে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এরই মধ্যে বাগান থেকে প্রায় চার লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন তারা। বাগানে থাকা ফল থেকে আরও অন্তত তিন লাখ টাকার সাম্মাম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন জসিম ও রাজিব।
সম্প্রতি তাদের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, মাচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাম্মামের লতাগাছ। কোথাও সবুজ, কোথাও হলুদাভ রঙের গোলগাল ফল মাচা থেকে ঝুলছে। জাতভেদে ফলের বাইরের রঙে ভিন্নতা থাকলেও ভেতরের অংশ মিষ্টি, রসালো ও সুস্বাদু। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় তিন থেকে চার কেজি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি সাম্মাম বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ টাকায়। সে হিসাবে একেকটি ফলের দাম পড়ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। নতুন এই ফলের স্বাদ ও আকর্ষণীয় চেহারা ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে নানা বয়সী মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। কেউ পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার বাগানে দাঁড়িয়েই চেখে দেখছেন রসালো সাম্মাম। ফলে ফলের পাশাপাশি বাগানটিও হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র।
জসিম হোসেন ও রাজিব হাসানের সাফল্য দেখে বদলাতে শুরু করেছে স্থানীয় কৃষকদের ধারণাও। চাষ শুরুর দিকে নতুন ফল হওয়ায় অনেকেই এর বাজার ও উৎপাদন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু চোখের সামনে ফলন ও বিক্রির সাফল্য দেখে সেই সংশয় অনেকটাই কেটে গেছে। এখন আশপাশের কৃষকদের অনেকেই সাম্মাম চাষ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং আগামী মৌসুমে এই ফল চাষের কথা ভাবছেন।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, চুয়াডাঙ্গা ও জীবননগর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বিঘা জমিতে রকমেলন বা সাম্মাম চাষ হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি লাভজনক ফসলে পরিণত হতে পারে।
কৃষি কর্মকর্তার এই তথ্যের সঙ্গে যেন বাস্তবতারও মিল খুঁজে পাওয়া যায় জসিম ও রাজিবের বাগানে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ফলন, স্থানীয় বাজারে চাহিদা এবং ভালো দামে বিক্রির সুযোগÑসব মিলিয়ে সাম্মাম চাষে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার দেখতে পাচ্ছেন তারা। মরুভূমির আবহে বেড়ে ওঠা বিদেশি এই ফল এখন শেকড় গেড়েছে জীবননগরের উর্বর মাটিতে। পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্যের পর জসিম ও রাজিবের লক্ষ্য সাম্মাম চাষের পরিধি আরও বাড়ানো। তাদের এই উদ্যোগ শুধু নিজেদের সাফল্যের গল্প নয়, স্থানীয় কৃষকদের প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসলের দিকে আগ্রহী করে তোলারও একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।


