দামুড়হুদা অফিস:
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় উপজেলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা এবং কৃষিজমিতে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ নিয়ে পৃথক দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভাগুলোতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের আসক্তি কমাতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ এবং তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১২টায় উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ও শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর বেলা দেড়টার দিকে একই সভাকক্ষে কৃষিজমিতে পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার, জৈব প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি ও তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুটি সভাতেই প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। সভাপতিত্ব করেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতিমূলক সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে আসক্তি কমাতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি অংশের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কম থাকার বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। জেলা প্রশাসক বলেন, এসব শিক্ষার্থীর প্রতি বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। যথাযথ তদারকি না করলে শিক্ষার্থীদের কাক্সিক্ষতভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় অভিভাবকের মতো। তাই শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে শিক্ষক ও অভিভাবকÑউভয় পক্ষকেই সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সভায় দামুড়হুদা ও দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন জেলা প্রশাসক। পুলিশ, বিজিবি, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরেও সভায় নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় জানানো হয়, দামুড়হুদা উপজেলায় মোট ২২টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর ২০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বিঘ্নে উৎসব আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সভার পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। এরপর অনুষ্ঠিত কৃষিবিষয়ক সচেতনতামূলক সভায় কৃষিজমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জৈব সার ও জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, কৃষিজমির স্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষকদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়। তাই পরিমিত ও সঠিক নিয়মে সার ব্যবহারের পাশাপাশি জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, তামাক চাষ শুধু কৃষিজমির ক্ষতি করে না, এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। কৃষকদের তামাক চাষ থেকে বেরিয়ে এসে খাদ্যশস্যসহ লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
দুটি সভাতেই নব যোগদানকৃত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মশিউর রহমান, দামুড়হুদা মডেল থানার ওসি শেখ মেসবাহ্ উদ্দিন, দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হাসান তনু, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দর্শনা থানা বিএনপির সভাপতি খাজা আবুল হাসনাত, পৌর বিএনপির সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান বুলেট, জামায়াতে ইসলামীর দামুড়হুদা থানা আমির নায়েব আলী ও সেক্রেটারি আবেদ উদ দৌলা টিটন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু হাসান, একাডেমিক সুপারভাইজার রাফিজুল ইসলাম, দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশ, দর্শনা প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকরামুল হক পিপুল, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা সাইফুন নাহার, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হোসনে জাহান, দামুড়হুদা শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সঞ্জয় হালদার, সাধারণ সম্পাদক শোভন দাস, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
দামুড়হুদায় পৃথক অভিযানে চারজন গ্রেপ্তার
ইয়াবা ও চোরাই ইজিবাইকের ব্যাটারি উদ্ধার, সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামিও গ্রেপ্তার
দামুড়হুদা থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে চারজন গ্রেপ্তার
ইয়াবা ও চোরাই ব্যাটারি উদ্ধার ॥ আদালতে ৩ ব্যক্তির সাজা
দামুড়হুদা অফিস: দামুড়হুদায় পৃথক অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে দামুড়হুদা মডেল থানা পুলিশ। তাদের মধ্যে একজনের কাছ থেকে তিন পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং দুজনের কাছ থেকে চোরাই তিনটি ইজিবাইকের ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলার তদন্তে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে গতকাল বুধবার চারজনকেই চুয়াডাঙ্গার আদালতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে মাদক ও চোরাই ব্যাটারি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার শেষে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ারের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মেসবাহ্ উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে বিশেষ অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।
পুলিশ জানায়, গত ৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার ইব্রাহীমপুর গ্রামের কবরস্থানের প্রধান ফটকের সামনে পাকা সড়কে অভিযান চালান উপপরিদর্শক (এসআই) প্রদীপ বিশ্বাস ও তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এ সময় বিষ্ণুপুর মাঝেরপাড়ার আমির হোসেনের ছেলে টিপু সুলতানকে (৩২) গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে তিন পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, গতকাল বুধবার সকাল সাতটার দিকে দশমীপাড়া গ্রামের জাহিদ মাস্টারের বাড়ির প্রাচীরের পাশ থেকে আক্কাচ আলী (৪৩) ও হাতেম আলী (২৩)কে গ্রেপ্তার করা হয়। আক্কাচ আলী ফিরোজ আলীর ছেলে এবং হাতেম আলী আমির হামজার ছেলে। তাদের কাছ থেকে চোরাই তিনটি ইজিবাইকের ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে টিপু সুলতান, আক্কাচ আলী ও হাতেম আলীকে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচারের জন্য চুয়াডাঙ্গার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত টিপু সুলতানকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আক্কাচ আলী ও হাতেম আলীকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাদের প্রত্যেককে আরও ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
এদিকে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলার তদন্তেও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দামুড়হুদা মডেল থানার এসআই ফাহিম হোসেন সঙ্গীয় কর্মকর্তা ও ফোর্স নিয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি সুলতান আহম্মেদকে (৬২) গ্রেপ্তার করেন। তিনি মুক্তারপুর রিফুজি পাড়ার মৃত দিদার হোসেনের ছেলে। পুলিশের দেয়া তথ্যে সুলতান আহম্মেদের রাজনৈতিক পরিচয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দামুড়হুদা মডেল থানার মামলা নম্বর-০৮, তারিখ ৬ জুন ২০২৬। মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৮/৯/১০/১১/১২/১৩ ধারায় করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাকেও আদালতে পাঠানো হয়েছে।
দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মেসবাহ্ উদ্দিন বলেন, গ্রেপ্তার চারজনকেই গতকাল চুয়াডাঙ্গার বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং চোরাকারবারি, মাদক ক্রয়-বিক্রয়কারী, দস্যুতা, ছিনতাই, ডাকাতি ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক, চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।


