মেহেরপুর অফিস:
মেহেরপুরের মাঠে নতুন এক বিদেশি ফলের চাষ শুরু হয়েছে। প্যাশন ফ্রুটÑস্থানীয়ভাবে ‘আনারকলি’ নামে পরিচিতÑএবারই প্রথমবারের মতো জেলাটিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন এক কৃষক। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের যুবক মিঠু দেড় বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন আনারকলির বাগান। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে গাছে ফুল ও ফল আসায় নতুন এই ফলের চাষ নিয়ে আশাবাদী তিনি।
মেহেরপুর সারা বছর নানা ধরনের সবজি চাষের জন্য পরিচিত। ধান, কলা ও বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি এবার জেলার কৃষিতে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন স্বাদের এই বিদেশি ফল। কৃষক মিঠুর হাত ধরে পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে আনারকলির বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনাও দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের মিঠু পারিবারিকভাবেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে কলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যবসাও করেন তিনি। প্রায় এক বছর আগে ইউটিউবে প্যাশন ফ্রুট চাষের একটি ভিডিও তার নজরে আসে। নতুন ও লাভজনক এই ফলের চাষ তাকে আকৃষ্ট করে। এরপর আর দেরি না করে ঝিনাইদহ থেকে ভালো জাতের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। অন্যের জমি লিজ নিয়ে দেড় বিঘা জমিতে ২৩০টি চারা রোপণ করেন মিঠু। পরিচর্যার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। বর্তমানে বাগানের প্রতিটি গাছের ডালজুড়ে ঝুলছে কাঁচা-পাকা আনারকলি।
সরেজমিনে মিঠুর বাগানে গিয়ে দেখা যায়, লতানো গাছের গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটেছে আকর্ষণীয় ফুল। কোথাও ছোট ছোট কাঁচা ফল, কোথাও আবার পাকতে শুরু করেছে আনারকলি। সবুজ পাতার সঙ্গে ফল ও ফুলের মিশেলে পুরো বাগানটি পেয়েছে ভিন্ন রকমের সৌন্দর্য। মিঠু জানান, বাগানে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেননি। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে বাগানের পরিচর্যা করছেন তিনি। জমির লিজসহ এ পর্যন্ত তার প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্যাশন ফ্রুটের চাহিদা ও ভালো দাম থাকায় আশাবাদী মিঠু। তার ধারণা, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ মৌসুমে বাগান থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার আনারকলি বিক্রি করতে পারবেন। ইতোমধ্যে ফল পাকতে শুরু করেছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই বাগানের ফল বাজারজাত করা শুরু হবে বলে জানান তিনি।
নতুন এই ফলের চাষে খরচ তুলনামূলক কম এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কম হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গোভীপুরের কৃষক আল আমিন, ফরজ ও ইয়াস আলী বলেন, মেহেরপুরের মাঠে তারা আগে কখনো এ ধরনের ফলের চাষ দেখেননি। এতদিন তারা ধান, কলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছেন। তবে অনেক সময় আশানুরূপ লাভ হয়নি। তারা বলেন, শুরুতে মিঠুর বাগানে নতুন ধরনের গাছ দেখে তেমন কিছু বুঝতে পারেননি। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে হাসাহাসিও করেছেন। কিন্তু এখন গাছে যেভাবে ফুল ও ফল এসেছে, তা দেখে তাঁদের ধারণা বদলে গেছে। তাদের মতে, উৎপাদন খরচ কম এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হলে সঠিকভাবে বাজারজাত করা গেলে এই ফলের চাষে কৃষকেরা লাভবান হতে পারেন।
আনারকলি চাষি মিঠু বলেন, ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি বিভিন্ন সবজির ব্যবসা করি। ইউটিউবে বিভিন্ন ফল ও ফসলের ভিডিও দেখতে দেখতে হঠাৎ প্যাশন ফ্রুটের একটি ভিডিও চোখে পড়ে। নতুন ফল দেখে এটি চাষ করার সিদ্ধান্ত নিই। পরে ঝিনাইদহ থেকে চারা সংগ্রহ করে জমিতে লাগাই। তিনি বলেন, শুরুতে গাছ লাগানোর পর অনেকেই হাসাহাসি করেছেন। নানা কথা বলেছেন। কিন্তু গাছে ফুল ও ফল আসার পর তাদের ধারণা বদলে গেছে। এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আমার বাগান দেখতে আসছেন। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মিঠু বলেন, সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে মেহেরপুরের উর্বর মাটিতে আনারকলি চাষ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। তার মতে, এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ ভবিষ্যতে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, মেহেরপুরে নতুন এই ফলের চাষ শুরু হওয়ায় কৃষিতে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তারা আশা করছেন, চাষি সফল হলে অন্য কৃষকেরাও এ ধরনের ফল চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষকদের সফল করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার উদ্যোগ থাকবে।
মেহেরপুরের মাঠে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই আনারকলির বাগান এখন শুধু নতুন একটি ফলের চাষ নয়, স্থানীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। মিঠুর বাগানে ফলনের সাফল্য ও বাজারজাতকরণ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে মেহেরপুরের কৃষকদের মধ্যে এই নতুন ফলের চাষ কতটা ছড়িয়ে পড়ে।


